সাপ কৃষকের বন্ধু

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৫, ০২:৪২ এএম

সাপ আমাদের পরিবেশের অন্যতম এক উপাদান, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু কারণে-অকারণে বা গুজবে আকৃষ্ট হয়ে আমরা সাপ হত্যা করে থাকি। সম্প্রতি দেশে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপ নিয়ে কিছু অসচেতন মানুষ গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে। এই আতঙ্কের কারণে সারা দেশে সাপ নিধনের এক নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছি আমরা সবাই। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে সাপ নিয়ে নানা রকম অপধারণার শিকার হচ্ছেন। ভয়ানক বিষয় হলো, চন্দ্রবোড়া সাপের নামে পরিচিত কিন্তু উপকারী ও নির্বিষ অনেক সাপকেও দেখা মাত্র মেরে ফেলা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই বিষয়টি উৎসবে পরিণত হয়েছিল; নিরীহ সাপকে ধরে সবার সামনে হত্যা করা হয়েছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য খুবই লজ্জার। আমরা কেন ভুলে যাচ্ছি, যখন একটি প্রজাতি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় বা বিলুপ্ত হয়, তখন পরিবেশে যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা আমাদের পক্ষে মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। আমরা শত চেষ্টা করেও কখনো প্রকৃতি থেকে একটি প্রজাতিকে বিলুপ্ত করার খেসারত দেওয়ার মতো কোনো যোগ্যতা বা সক্ষমতাও আমাদের নেই।

প্রকৃতিতে সাপের প্রয়োজনীয়তা অনেক, এক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কৃষিজমি, বসতবাড়ির ইঁদুরসহ বাসার আশপাশের অন্যান্য অনেক ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বিরাট ভূমিকা পালন করে এই সাপ। এমনকি কিছু নির্বিষ সাপ অন্য বিষাক্ত সাপ খেয়ে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। সাপের বিষে থাকা প্রোটিন এবং এনজাইম দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি করা হয়। এর বাইরে আরও অনেক কারণে সাপ আমাদের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে।

ইঁদুরের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কারখানা, খাদ্য গুদাম, ছোট-বড় দোকান এবং বেকারিতে প্রতিনিয়ত ইঁদুরের কারণে যে ক্ষতি সাধিত হয়, তা আমাদের ভাবনার বাইরে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আমাদের দেশে প্রতি বছর ইঁদুরের কারণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়, যা আমাদের সহজ-সরল কৃষক ভাইদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের (ইরি) তথ্য মতে, ইঁদুরের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ হলো বাংলাদেশ, যেখানে ইঁদুরের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ২০২২ সালে প্রায় ৪৯৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার ফসল নষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি ৫৯ হাজার ইঁদুর নিধন করা হয়, যেখানে ফসলের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৪২ মেট্রিক টন।

সাপের সংখ্যা যদি হ্রাস পায়, তাহলে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাবে, যা ফসলের পাশাপাশি অন্যান্য ঝুঁকিও বৃদ্ধি করবে। যেমন ইঁদুর হান্টা ভাইরাস, স্যালমোনেলা, বিউবোনিক প্লেগ, র‌্যাট-বাইট ফিভার এবং লেপ্টোস্পাইরোসিস-এর মতো রোগ ছড়াতে সক্ষম এবং এসব ভাইরাস মানুষের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ।

পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার প্রজাতির সাপ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০ প্রজাতির সাপে কোনো বিষ নেই। আমাদের দেশে জল ও স্থলে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার চার ভাগের তিন ভাগই নির্বিষ। আমরা বেশিরভাগ সময় আমাদের ঘরের আশপাশে কিছু পরিচিত সাপ দেখি, তার মধ্যে অন্যতম ঘরগিন্নি, দুধরাজ, ঢোড়া, পাইন্যা, অজগর, গোখরা ইত্যাদি। এ সাপগুলো আমাদের কোনো ধরনের ক্ষতি করে না। কিন্তু গুজব ছড়ানো হয়, এই সাপ কামড় দিলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, অনেক বিষাক্ত সাপের দংশনে আক্রান্ত রোগীরাও সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেছেন।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ এর ৩৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, আত্মরক্ষা ছাড়া বন্যপ্রাণীকে ধরা, ক্ষতি করা বা হত্যা করলে ১ থেকে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো মূল্যবান প্রাণী ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা বা ক্ষতি করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়াও, সাপ যেহেতু পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সুতরাং সাপ হত্যা বা ক্ষতি করলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর অধীনে শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যেহেতু CITES (Convention on International Trade in Endangered Species of Wild Fauna and Flora) এর স্বাক্ষরকারী দেশ এবং আমরা জানি সাপ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা ও ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই সাপসহ অন্য প্রাণীদের হত্যা থেকে বিরত থাকতে হবে।

আমাদের উচিত সাপ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া, সাপের গতিবিধি লক্ষ করা এবং সাপের প্রজাতি চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। যেখানে সাপের আনাগোনা বেশি, সেখানে যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে যাওয়া দরকার। বিশেষ করে পা ও হাতে মোটা কাপড় কিংবা গামবুট পরা; টর্চ লাইট ব্যবহার করা; মাঠে কিংবা খেতখামারে গেলে সঙ্গে লাঠি রাখা এবং ঝোপঝাড়ে আঘাত করা, যেন বিষাক্ত কিছু থাকলে তা স্থান ত্যাগ করে; সাপের দংশনের শিকার হলে দ্রুত ডাক্তার কিংবা কাছাকাছি ক্লিনিকে যাওয়া। এভাবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমবে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত