২০২৬ বিশ্বকাপে তীব্র গরমের শঙ্কা, ফুটবলারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা?

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৫, ০৯:১৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের এক ম্যাচ খেলতে নেমে মার্কিন মিডফিল্ডার ট্যাব রামোসে মনে হয়েছিল যেন উনুনে পুড়ছেন বলে। সেদিন মাঠের তাপমাত্রা ছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস! এমন ভয়ংকর গরমে কাতর হয়ে গ্যালারিতে দর্শকেরাও অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। তিন দশক পর আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। সঙ্গে আছে মেক্সিকো ও কানাডা। কিন্তু এবারও দলগুলোকে চরম গরমের পরীক্ষায় নামতে হতে পারে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে আয়োজক ১৬ শহরের মধ্যে ১৪টিতেই দুপুরের গরম ফুটবলারদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োমেটিওরোলজি'-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দুপুরের ম্যাচগুলো খেলোয়াড়দের গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলবে।

বিশেষ করে ইস্ট রাদারফোর্ড, ফক্সবরো, কানসাস সিটি, মায়ামি, মনটেরি ও ফিলাডেলফিয়ার মতো উন্মুক্ত স্টেডিয়ামগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

তাপমাত্রা কতটা ভয়ংকর হতে পারে?

২০২২ কাতার বিশ্বকাপকে গ্রীষ্মের তীব্র গরম এড়াতে নভেম্বর-ডিসেম্বরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তখন সর্বোচ্চ ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা ছিল ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার ২৮ ডিগ্রির বেশি হতে পারে, যা ফুটবলারদের জন্য বিপজ্জনক।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ৩২ ডিগ্রি ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার হলে কুলিং ব্রেকের পরামর্শ দিলেও অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের মতো আরও সতর্ক সংস্থাগুলো ২৮ ডিগ্রিতেই ম্যাচ স্থগিতের সুপারিশ করে।

তবে এর আগেও দেখা গেছে, ২৮ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা থাকলেও ফুটবলার ও রেফারিদের সমস্যা হতে পারে। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় কানসাস সিটিতে ২৭.৫ ডিগ্রি ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচারের এক সহকারী রেফারি মাঠেই অজ্ঞান হয়ে যান। মায়ামির গরমে খেলতে নেমে উরুগুয়ের রোনাল্ড আরাউহোকেও ডিহাইড্রেশনের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল।

বিকল্প কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত ম্যাচ না রাখলেই ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব। তবে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম দুই রাউন্ডে প্রতিদিন চারটি করে ম্যাচ হবে। গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে ছয়টি ম্যাচ এক দিনে আয়োজন করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে টিভি সম্প্রচার সুবিধার জন্য ফিফা দুপুরের ম্যাচ বাদ দেবে কি না, সেটিই প্রশ্ন।

এদিকে খেলোয়াড়দের প্রতিনিধি সংস্থা ফিফপ্রো ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার ২৬ ডিগ্রি হলে কুলিং ব্রেক এবং ২৮ ডিগ্রিতে ম্যাচ স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সেটিও যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ।

বিশ্বখ্যাত তাপমাত্রা বিশেষজ্ঞ ড. গ্লেন কেনির মতে, 'একটি নির্দিষ্ট ওয়েযত বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার সীমা নির্ধারণ করলেই ঝুঁকি কমবে না, কারণ প্রতিটি খেলোয়াড়ের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। কেউ টানা ১৪ দিন গরমে খেললে তার শরীরের প্রতিক্রিয়া প্রথম দিনের চেয়ে আলাদা হবে।'

শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত হবে গরমের প্রভাব

২০২৬ বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের জন্য আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, টুর্নামেন্টটি হবে ক্লান্তিকর ক্লাব মৌসুমের পরপরই। ইউরোপিয়ান লিগে খেলোয়াড়রা মে মাস পর্যন্ত ৫০-৫৫টি ম্যাচ খেলবেন। তারপর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বকাপের কঠিন সূচিতে নামতে হবে।

ক্লাইমেট বিশেষজ্ঞ ড. ডোনাল মুলানের মতে, 'ক্লান্তি ও চরম গরম একসঙ্গে মিললে খেলোয়াড়দের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।'

২০২৪ কোপা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড গরমের এক গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তাহলে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এখন পর্যন্ত ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা দুপুরের ম্যাচগুলো বাদ দেওয়ার জন্য জোরালো সুপারিশ করছেন।

এখন দেখার বিষয়, ফিফা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কতোটা গুরুত্ব দেয়, নাকি টেলিভিশন সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত