গণতান্ত্রিক চেতনার চর্চা ও গণতন্ত্র

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৫, ১২:৩০ এএম

অসুন্দরের প্রতিযোগিতা চলছে, যা দেশের চরম অবক্ষয়ের প্রতিফলন। পরিবেশের অবস্থা ভয়াবহ। নদী, খাল, বিল, হাওর সবই দখল, ভরাট এবং দূষণের শিকার। পাহাড়, পর্বত, নালা-জলা, খেলার মাঠ, পুকুর, ডোবা সবই দখল হয়ে যাচ্ছে। শিশুখাদ্যে ভেজাল, ফলমূলেও বিষ, ব্যবহার সামগ্রী, পরিধান সামগ্রী সবই আজ বিষাক্ত। এমনকি ওষুধের ক্ষেত্রেও ভেজাল! বাংলাদেশে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি তাতেও নেই স্বচ্ছতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নেই, হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, আদালতে ন্যায়বিচার নেই, রাষ্ট্রে সুশাসন নেই, নেই মানবাধিকার! চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণ চলছে এবং অবিরাম চলছে এভাবে বেঁচে আছে বাংলাদেশ। কিন্তু কেন? সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের স্বার্থে কাজ করতে ব্যর্থ এবং রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসন নিজেদের স্বার্থে দেশের ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে কিন্তু কেন?

এই ‘কেন’র উত্তর খুঁজতে গত জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থান করেছিল। যা ছিল জনগণের দীর্ঘদিনের দুঃখ, স্বৈরাচারী শাসন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবাদ। আন্দোলন একদিকে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল, অন্যদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্নকে উজ্জীবিত করেছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশের মানুষ ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দেয়। কিন্তু, ৬ মাস পরে ড. ইউনূসের সরকারের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিদ্যমান কঠিন বাস্তবতা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রয়োগ, বাস্তবায়ন, ধারণ ও ক্রমাগত অনুশীলন অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং স্বাধীনভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যার মূল কারণ লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে সুবিন্যস্ত এবং শেকড় গেড়েছে। এই অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে সুস্থধারার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক চেতনা ও সংস্কৃতি বিনির্মাণ করতে হবে।

গণতন্ত্র জনগণের মতামত, অধিকার, স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের ক্ষমতায়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ। জন লকের মতে, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তির অধিকার, স্বাধীনতা ও সামাজিক চুক্তি। তিনি বলেন, ‘নাগরিকরা যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হয়, তবে রাষ্ট্র সহজেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে।’ তাই তিনি জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। গণতন্ত্রের দুটি প্রধান ধরন রয়েছে; প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, যেখানে জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচিত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং সরাসরি গণতন্ত্র, যেখানে জনগণ সরাসরি আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়। বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো অপরিহার্য। রুশো গণতন্ত্রকে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা হিসেবে দেখতেন। তার ‘সামাজিক চুক্তি’ তত্ত্বে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব, যখন জনগণ সক্রিয়ভাবে তাদের শাসক নির্বাচনে অংশ নেয় এবং নৈতিকভাবে সচেতন থাকে।’ তিনি নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা শিক্ষা, চর্চা এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। যেমন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। চিন্তা, মতামত ও সমালোচনার সুযোগ অবারিত করা। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গড়ে তোলা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উচিত আইনের শাসন, সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। সমাজে সচেতনতা, সহনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বাড়ানোর জন্য নাগরিকদের দায়িত্ব পালন প্রয়োজন। ব্যক্তি পর্যায়ে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সুসংহত হয়। গণতন্ত্র কেবল শাসনব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক। জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এখন সময় এসেছে গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল ও কার্যকর করার। এর জন্য সরকার ও রাষ্ট্রকে জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক হতে হবে। আইন-আদালত থেকে প্রশাসন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন গণতন্ত্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ, যা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে। গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, এটি জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেরও প্রতীক। মৌলিক চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে গণতন্ত্র অর্থবহ হবে না। সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ আলোচনা ও বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পায়, যা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষিত থাকলেই কেবল জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা করা নয়, বরং এমন কাজ করা যা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ব্যক্তি তার মতপ্রকাশ করতে পারে, কিন্তু অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সবাই সমান সুযোগ ও অধিকার ভোগ করতে পারে। এটি কেবল ধনী-গরিব বা ক্ষমতাবানদের জন্য নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। যখন কেউ ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না, অন্যায়ের শিকার হবে না, ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং মতপ্রকাশের জন্য ভয় কোনো পাবে না। এটি এমন রাষ্ট্র, যেখানে জনতার মতামত ও ভোটের অধিকার সম্মান করা হয়, সরকার জবাবদিহিমূলক হয় এবং শোষণহীন শাসন নিশ্চিত করা হয়। যদি কেউ দারিদ্র্যের শিকার হয়ে বঞ্চিত থাকে, চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়, বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে নির্যাতিত হয় তবে সেটি গণতন্ত্র নয়।

গণতন্ত্র মানে বাধামুক্ত জীবন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠিত হবে। মূল লক্ষ্য হলো বৈষম্য দূর করা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনা এবং সবার জন্য সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সম্প্রীতিমূলক গণতান্ত্রিক চেতনা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে ওঠে। যেখানে ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণ হবে। গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর করতে হলে গণতান্ত্রিক চেতনার প্রসার অপরিহার্য। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক আদর্শ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, যা নাগরিকদের মধ্যে বিকাশ লাভ করতে হয়। শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সাম্য, রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে শুধু কাঠামোগত ব্যবস্থা নয়, বরং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ও তার বাস্তবায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হয়, তাদের চেতনায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নির্মাণ না হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল নামে একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে থাকবে, কিন্তু তা কার্যকর হবে না।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংগঠনিক সম্পাদক, ডিইউজে

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত