হামজায় মুগ্ধ সুনীলের বাবাও

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৫, ০১:২০ এএম

চল্লিশের সুনীল ছেত্রীর অবসর ভেঙে ফেরায় ভারতের ফুটবলপ্রেমীরা নতুন করে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছেন। সবার বিশ্বাস, সুনীলের ছোঁয়ায় দুঃসময় কাটিয়ে ভারত ফিরবে কক্ষপথে। যার ইঙ্গিতও মিলেছে চারদিন আগে শিলংয়ের জওহর লাল নেহরু স্টেডিয়ামে মালদ্বীপকে ৩-০ তে হারানোর মধ্য দিয়ে। যার একটি গোল ছিল সুনীলের। একই বিশ্বাস হৃদয়ে লালন করে রেখেছেন বাবা খরগ বাহাদুর ছেত্রী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তাকে সবাই চেনে কে. বি. ছেত্রী নামে। রবিবার দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয় তার। সুনীলের ফেরায় যেমন তিনি উদ্বেলিত, একই সঙ্গে মুখিয়ে আছেন বাংলাদেশের হামজা চৌধুরীর খেলা দেখতে। হামজাও যে সুনীলের মতো মাঠ ও মাঠের বাইরে মুগ্ধতা ছড়িয়ে চলছেন। সুনীল-হামজা দ্বৈরথটা নিয়ে রোমাঞ্চিত কে. বি. ছেত্রী অবশ্য খুব করে চাচ্ছেন আরেকবার বাংলাদেশের হন্তারক হয়ে উঠুক ছেলে সুনীল।

দুদিন আগে সুনীল ফোন করেছিলেন বাবাকে। দিল্লিতে অবস্থান করা কে. বি. ছেত্রীকে শিলংয়ের গ্যালারিতে দেখতে চেয়েছিলেন ভারত তারকা। লম্বা ভ্রমণের ধকলের কথা ভেবে বাধ্য হয়েই সুনীলকে না বলতে হয়েছে কে. বি. ছেত্রীর। তবে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে টেলিভিশনের পর্দায়। স্ত্রী সুশীলাকে পাশে বসিয়ে ঠিকই ছেলের খেলার প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিতে জমিয়ে রাখবেন। ঠিক যেমনটা শেষ দুই দশক করেছেন ছেত্রী দম্পতি। কখনো গ্যালারিতে বসে, কখনো বা টেলিভিশনের পর্দায়- ভারতীয় জার্সিতে সুনীলের খেলা দেখতে ছাড়েননি। অথচ গত জুনে সুনীলের বুটজোড়া তুলে রাখার সময়টায় আবেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল তাদের। কে. বি. বলেন, ‘শেষটায় সুনীল অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। সেটা আমাদেরও আবেগাক্রান্ত করে ফেলে। বিশেষ করে ওর মা। ছেলের খেলা নিয়ে সারা জীবন দুশ্চিন্তা করে গেল মানুষটা।’ ছেলের প্রত্যাবর্তনের ম্যাচটা গ্যালারিতে থাকতে না পারা খানিকটা পোড়াচ্ছে তাকে, ‘মাঠে থাকতে পারলে তো খুবই ভালো হতো। তবে দিল্লি থেকে গৌহাটি গিয়ে আবার পাহাড়ি পথ ধরতে হবে চিন্তা করে যাইনি। ও (সুনীল) ফোন করে জানতে চেয়েছিল যেতে চাই কি না। মানা করে দিয়েছি ঠিক, তবে একটু খারাপও লেগেছে। সেটা কেবল সুনীলের জন্য নয়, আপনাদের হামজার জন্যও।’  

বাবার সঙ্গে সুনীল ছেত্রী

সুনীলের বাবা অপেক্ষায় আছেন, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দুই মহাতারকার ফুটবলীয় লড়াইটা দেখার জন্য, ‘সুনীল তো অবশ্যই নিজেকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছে যেখানে যেতে পারাটা সবার জন্যই স্বপ্নের। নিজের চেষ্টা, একনিষ্ঠতা ও পরিশ্রমেই ও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। হামজাও কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করেই দীর্ঘদিন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলে যাচ্ছে। সুতরাং আমার বিশ্বাস এই দুজনের লড়াইয়ে দৃষ্টি থাকবে সবার। আমিও খুব আশায় আছি অসামান্য একটা ফুটবল ম্যাচের।’ ছেলের কারণেই এ অঞ্চলের ফুটবলের হাঁড়ির খবর ভালোই জানা কে. বি ছেত্রীর। বাংলাদেশের বিপক্ষে সুনীল যে বারবার জ্বলে ওঠেন, সেটা নিজেই বললেন। আবার বাংলাদেশ দলেরও প্রশংসা করতেই ভুললেন না, ‘অন্তত দুই-তিনটা ম্যাচে ও বাংলাদেশকে জয় বঞ্চিত করেছে। আমার মনে পড়ে ২০১৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের কথা। সেই ম্যাচটায় ইনজুরি টাইমে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে ১-১ করেছিল সে। আমি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ক’টা ম্যাচ দেখেছি, আমার কাছে কোনোভাবেই তাদের (বাংলাদেশকে) পিছিয়ে থাকা দল মনে হয়নি। বিশেষ করে ২০১৯ সালে সল্টলেকে যে ফুটবলটা বাংলাদেশের ছেলেরা খেলেছে, সেটা ছিল অসাধারণ। প্রায় দুবছর পর দুদল মুখোমুখি হতে চলেছে। হামজা আসায় বাংলাদেশও নিশ্চয় আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তাই দারুণ একটা ম্যাচের আশায় আছি। তবে খুব করে চাই, সুনীলের গোলেই ভারত জিতুক। ফলাফল যেটাই হোক, ম্যাচটা হবে জমজমাট।’

সুনীল ছেত্রী

নেপালি-ভারতীয় কে. বি. ছেত্রীর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বারাকপুরে। এরপর বহু বছর তার কেটেছে দার্জিলিংয়ে। এ কারণেই বাংলাটা ভালোই বলতে পারেন। বাংলার মোহনবাগান দিয়ে পেশাদার ফুটবলে পা রাখা সুনীলের। বহু বছর অসংখ্য বাঙালি সতীর্থের সঙ্গে খেলেছেন। স্ত্রীও পশ্চিমবঙ্গের। অতটা ভালো না হলেও বাংলা ভাষাটা বোঝেন, ভাঙা ভাঙা বলতেও পারেন সুনীল। বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় জানলেই আগ্রহ ভরেই কাছে এসে কথা বলেন। ভারতের কিংবদন্তিতুল্য ফুটবলার হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে দাম্ভিকতার লেশমাত্র নেই। হামজাও যেন সুনীলের কপি-পেস্ট। বাবা কে.বি. ছেত্রীর কাছে এটাই বড় ফুটবলের বৈশিষ্ট্য। মাঠের বাইরের এই গুণাবলিই সুনীল, হামজাদের মহাতারকা বানিয়েছে। 

দুই মহাতারকার ফুটবলীয় লড়াইয়ের বাকি আর কয়েক ঘণ্টা। কে.বি. ছেত্রীর মতো বাংলাদেশ-ভারতের লাখো-কোটি ফুটবলভক্তও অপেক্ষায় সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হতে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত