এক যুগ পর আলোর দেখা মিলছে বে টার্মিনালে। চলতি মাসেই একনেকে উঠতে পারে আগামীর বন্দর বলে খ্যাত বে টার্মিনালের ব্রেক ওয়াটারসহ নেভিগেশন চ্যানেল নির্মাণ প্রকল্পটি। বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে চুক্তিবদ্ধ হওয়া পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি (পিএসএ) এবং দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর কষাকষিতে বসতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। আর এতেই আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে বে টার্মিনালে।
হালিশহর থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরের উপকূলে প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় নির্মিত হতে যাওয়া এই বে টার্মিনালে সাগরের অংশে একটি ডুবোচর রয়েছে। সেই ডুবোচরকে ব্রেক ওয়াটার হিসেবে নির্মাণ করে নির্মিত হবে বে টার্মিনাল। স্থলভাগে বে টার্মিনালের জন্য তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটি কনটেইনার টার্মিনালের একটি পিএসএ সিঙ্গাপুর ও অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্মাণ করবে বলে জি টু জি চুক্তি হয়েছে। অন্য মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করার কথা থাকলেও বিগত সরকারের সময়ে আবুধাবি পোর্টের সঙ্গে এ নিয়ে সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। তবে বন্দরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এ সমঝোতা চুক্তি বাতিল হতে পারে। এখন নতুন করে জি টু জি ভিত্তিতে অথবা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের আগ্রহী প্রতিষ্ঠান খোঁজা হতে পারে।
এদিকে টার্মিনাল ছাড়া বে টার্মিনালের বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি) নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পের আওতায় বে টার্মিনালের চ্যানেল তৈরি, চ্যানেল ঘিরে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ এবং টার্মিনালের সঙ্গে রেল ও সড়ক সংযোগ স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলোকে এ প্রকল্পের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। এর প্রাথমিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ বাজেটের সবচেয়ে বেশি টাকা জোগান দেবে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১০ হাজার কোটি এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা। প্রকল্পের আওতায় ব্রেক ওয়াটার নির্মাণে ৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেল নির্মাণে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৪৫ লাখ, নেভিগেশনে সহায়ক যন্ত্র স্থাপনে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ এবং রেল ও সড়ক সংযোগসহ অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, বে টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্পটি সম্প্রতি প্রি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে এবং আমরা হয়তো তা এপ্রিলে একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে পারি। একই সঙ্গে দুটি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পিএসএস সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে পারে।
এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগে গত ৫ মার্চ তা প্রি একনেকে উপস্থাপনের পর কিছু পরামর্শসহ একনেকে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া বে টার্মিনাল প্রকল্পে পিএসএস সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগের নিয়োগকৃত ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর বাতিল করা হয়েছে। এখন নতুন ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগের আগে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন কী হবে, তা চূড়ান্ত করার কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তা চূড়ান্ত হলেই ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগের মাধ্যমে পিএসএস সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু হবে। উভয় টার্মিনাল নির্মাণে বন্দরে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটি এবং আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড। একই সঙ্গে মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি বরাদ্দের বিষয়েও হয়তো নতুন কিছু আসতে পারে।
ব্রেক ওয়াটার কী : বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি ও প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হালিশহর ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বে টার্মিনাল। এর মধ্যে ইপিজেডের পেছন দিকে সাগরের প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে উত্তর দক্ষিণে লম্বালম্বি আকারে দুটি চর রয়েছে। এই চর দুটি ভাটার সময় প্রায় ডুবে যায়। কিন্তু চর ও উপকূলের মধ্যবর্তী অংশে পানির গভীরতা ৭ থেকে ৮ মিটার। ৭ থেকে ৮ মিটার গভীরতা থাকা এলাকাটি চওড়ায় রয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা এবং দৈর্ঘ্যে সাড়ে ৬ কিলোমিটার। সাগরের ভেতরের এই দুই চরকে শাসন করে ১৪ মিটার চওড়া ও ৫ থেকে ৬ মিটার উচ্চতার দেয়াল নির্মাণ করা হতে পারে। আর এ দেয়ালকে বলা হয় ব্রেক ওয়াটার। উপকূলের অংশে নির্মাণ হবে জেটি। জেটি ও ব্রেক ওয়াটারের মধ্যবর্তী জায়গায় এসে জাহাজগুলো প্রবেশ করবে।
সাগর থেকে আসা বড় বড় ঢেউয়ের আঘাতে যাতে জেটি নষ্ট না হয় সেজন্য দূর থেকেই ঢেউটিকে বাধা দেওয়ার জন্য ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে হয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরেও সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করা হয়েছিল। বিশ্বের অনেক বন্দরে কৃত্রিমভাবে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু বে টার্মিনালের সাগরের অংশে এ ধরনের একটি চর থাকাতে প্রাকৃতিকভাবেই ব্রেক ওয়াটার সুবিধা পাওয়া গেছে। এখন শুধু এই প্রাকৃতিক চরকে শাসন করে ব্রেক ওয়াটারটি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর ফলে উপকূলের দিকে থাকা জেটি নিরাপদ থাকে।
পূর্বের প্রেক্ষাপট : ২০১৩ সালে বে টার্মিনাল নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের পর ২০১৪ সালের মে মাসে ভূমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে ভূমি বরাদ্দের ছাড়পত্রের জন্যও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) আবেদন করা হয়। সিডিএতে আবেদনের ১৭ মাস পর ছাড়পত্র পাওয়া যায়। অন্যদিকে অধিগ্রহণের প্রথম দফায় ৬৭ একর বরাদ্দ পায় ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বরে। পরে ৫০০ একর বরাদ্দ পেলেও এখনো ৩০৩ একর বরাদ্দের বাকি রয়েছে। এই টার্মিনালে ২০২৬ সালে অপারেশন কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে পূর্বেকার সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বলা হলেও এখনো বে টার্মিনাল ধু-ধু বালুচর। কোনো স্থাপনাই নির্মাণ করা যায়নি। ভূমি অধিগ্রহণ-বিনিয়োগ-ডিজাইন সংশোধন এবং অর্থায়নসহ নানা জটিলতায় বারবার পিছিয়েছে এই বে টার্মিনালের নির্মাণকাজ।
হালিশহর ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বে টার্মিনাল নির্মিত হবে। এখানে ১২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল এবং প্রতিটি ১১২৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল হবে। দুটি কনটেইনার টার্মিনালের একটি পিপিপির আওতায় নির্মাণ করবে পোর্ট অব সিঙ্গাপুর ও অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। অন্য মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করার কথা। সাগরের ভেতরের প্রায় ২৩০০ একর জায়গায় নির্মিত হতে যাওয়া বে টার্মিনালে জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফটের (গভীরতা) কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বে টার্মিনাল নির্মাণ হলে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বিপরীতে বর্তমান বন্দর চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রেও জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু বে টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। বিদ্যমান পোর্ট জেটিতে একসঙ্গে ১৬টি জাহাজ বার্থিং করা গেলেও বে টার্মিনালে গড়ে প্রায় ৫০টি জাহাজ একইসঙ্গে বার্থিং করা যাবে। বন্দরের জেটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটার হলেও বে টার্মিনালের দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এদিকে ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া বে টার্মিনাল চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব গোচাবে বলে বন্দরসংশ্লিষ্টদের ধারণা।
