হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই কৃষির গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে তৈরি হয় অস্থিরতা, অচলাবস্থা, যা দূর করতে সরকার তৎকালীন সচিব ওয়াহিদা আক্তারকে সরিয়ে আগস্টের মাঝামাঝিতে নিয়োগ দেয় আরেক আওয়ামীপন্থী আমলা ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে। যিনি সচিব হওয়ার পর থেকে দপ্তরগুলোতে অচলাবস্থা দূর করার বিপরীতে সংস্থাগুলোতে আওয়ামীপন্থীদের টিকিয়ে রাখা, বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি করে অস্থিরতা টিকিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সচিবের ভাষ্য, আরও এক-দুই বছর এমন চলবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বড় সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান যোগদানের প্রায় আট মাস পার হতে চললেও এখনো পর্যন্ত একজন যোগ্য ‘মহাপরিচালক’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক মো. ছাইফুল আলমকে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। এ কর্মকর্তা তার উইংয়ের কাজের পাশাপাশি মহাপরিচালকের বাড়তি দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
ডিএইর কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত যে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে, তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিচালনার জন্য একজন মহাপরিচালক না থাকাটা একটা বড় সংকট। যে কারণে সংস্থাটির পরিচালিত ৩১টি প্রকল্পের মধ্যে আট মাসে মাত্র ১০ জন্য ‘প্রকল্প পরিচালক’ পরিবর্তন করা হয়েছে, বাকিগুলোতে এখনো আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগীরাই রয়েছেন। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত প্রকল্পগুলোর ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় প্রকল্প পার্টনারের গড় বাস্তবায়ন অগ্রগতি মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির চেয়ে অনেক কম। কারণ প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক মিজানুর রহমান প্রকল্প বাস্তবায়ন সঠিকভাবে করতে না পারলেও তাকে প্রকল্প পরিচালক পদে বহাল রেখেছিলেন সাবেক সচিব। কিন্তু যখন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ছুটির দিনে ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে প্রতিবেদন হয় এবং এর সত্যতা পাওয়ায় বাধ্য হয়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
একই অবস্থা দেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি)। যেখানে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানকে মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটিও ‘রুটিন দায়িত্ব’। প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প পরিচালক যারা আছেন তাদের সবাই আওয়ামী সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। অথচ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির তিনটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির চেয়ে কম বলে উঠে এসেছে মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণেই। অর্থাৎ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হচ্ছে না। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত ড. মো. আবুল কালাম আজাদকে। পদোন্নতিতে জটিলতা বিষয়ে গত ১৮ মার্চ এ মহাপরিচালককে অপসারণের দাবিতে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা ময়মনসিংহে অবস্থিত বিনার কার্যালয়ে মানববন্ধন করেন এবং তার কক্ষে তালা দিয়ে দেন। ওই অচলাবস্থা এখনো চলমান বলে জানা গেছে।
বিনার মতো একই অবস্থা তৈরি হয়েছে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে। রুটিন দায়িত্বে মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. নার্গীস আক্তারকে। এ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার আগে মহাপরিচালক পদে যাওয়ার যোগ্য চার কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে। যে কারণে এখানেও অস্থিরতা রয়েছে।
সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল আউয়াল জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এবং অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগে কর্মকর্তারা তার পদত্যাগ দাবি করার পর নার্গীস আক্তারকে মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এরপর কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে পদত্যাগের দাবি করেন প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বাইরে রাস্তায় পোস্টারিং করে। কিন্তু এখনো তার ওপরই ভরসা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব।
পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে। সাবেক কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের সময়ের ব্যাপক সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ড. সালাহউদ্দিন আহমেদকে রুটিন দায়িত্বেই মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ কর্মকর্তা আবার প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের পরিচালক হিসেবে রুটিন দায়িত্বে এনেছেন ড. মো আবদুল হাকিমকে। এ পদের জন্য যোগ্য তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটিতে থাকলেও চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা আবদুল হাকিমকে প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ব্যাপকভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে গবেষণা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
একই রকম অবস্থা কৃষির ১৪টি সংস্থার বেশিরভাগেই। যে কারণে বিভিন্ন বিভাগের কাজেও কর্মকর্তাদের মনোযোগ কম। যার প্রতিক্রিয়া সার্বিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪টি সংস্থার প্রকল্প ও প্রোগ্রামসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ করে। এ সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর উপস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান সভাপতিত্ব করেন।
মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব সংস্থার প্রধানদের উপস্থিতিতে সভায় ১২টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে প্রথম সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘দপ্তর সংস্থার প্রদানরা কর্তৃক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
কিন্তু বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৃষির বেশিরভাগ প্রকল্পগুলোই ঠিকভাবে চলছে না। কারণ যেসব প্রকল্পে আওয়ামী সুবিধাভোগীরা রয়েছেন, তারা চাইলেও ঠিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। যার উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র থেকেই।
কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, বরং কোনো কোনো সংস্থায় আওয়ামীপন্থীদের পদায়ন করে আরও জটিলতা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। অথচ এসব জটিলতা নিরসনেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব গত আগস্টের মাঝামাঝিতে নিয়োগের পর থেকে টানা শতাধিক মিটিং করেছেন। কিন্তু তার দৃশ্যমান কোনো ফল নেই মাঠে।
ডিএইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি সচিব ডিএইর বেশিরভাগ প্রকল্পে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগীদের ওপর এখনো ভরসা করছেন। যেমন কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পিডি শহিদুল ইসলাম, লেবু জাতীয় ফলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের পিডি ফারুক আহমদসহ অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তারা ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে মাঠে নেমে কাজ করেছেন এবং ব্যানার ফেস্টুন তৈরিতে প্রকল্প থেকে অর্থ প্রদান করেছেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব তাদের ওপরই ভরসা রেখেছেন।
সম্প্রতি বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রশীদকে ডিএইর প্রশাসন উইং থেকে মেহেরপুরে বদলি করে দেওয়া হয়। সেখানে অবশ্য বিএনপিপন্থী আরেক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে সেটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও ডিএইতে দুদিনব্যাপী মানববন্ধনসহ ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরে অবশ্য মাহবুব রশীদ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এবং কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে এর প্রতিকার চেয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএইর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহবুব রশীদকে বদলি করার মধ্য দিয়ে ডিএইতে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিবাদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
কৃষি সচিবের এসব কার্যক্রমের কারণে তার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ফ্যাসিস্ট আমলা হিসেবে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ছিলেন ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী’ উদযাপন অনুষ্ঠান সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের একটি বিশেষ কমিটির সদস্য। তখন থেকেই এ আমলার ব্যাপক আওয়ামী-ঘনিষ্ঠতা সবার সামনে আসে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দপ্তরগুলোতে পূর্ণাঙ্গ মহাপরিচালক নিয়োগ করার মতো যোগ্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিচালক পদে চাকরির পর তাদের মহাপরিচালক হতে হয়, কিন্তু এমন লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এ সমস্যাটা আরও এক-দুই বছর থাকবে। যে কারণে রুটিন দায়িত্বে মহাপরিচালক দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব জায়গায় মহাপরিচালকদের বা অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, সেটা কিছু কর্মকর্তার স্বার্থের জায়গা থেকে করা হচ্ছে। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের চেয়ে ভালো কর্মকর্তা দপ্তরগুলোতে আমরা পাইনি।’
এখনো বিভিন্ন স্থানে যেসব আন্দোলন, দাবিদাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে, সেগুলো সংস্থাগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, জানতে চাইলে সচিব এমদাদ উল্লাহ বলেন, ‘এগুলো অল্প কিছু কর্মকর্তার কাজ। এতে করে সামান্য যা সমস্যা হচ্ছে, সেটা সার্বিক কাজকর্মে খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না।’
