গ্রামে এখন কোকিল ও দোয়েলের ডাক কেড়ে নিয়েছে উন্নয়নের নামে বৃক্ষনিধন, নদী ভরাট এবং আধুনিকতার সব উপসর্গ। নতুন বাংলা বছরের আগমন পহেলা বৈশাখ। একসময় গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হতো, ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণের আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে। ছোটবেলার দেখা বৈশাখী মেলায় থাকত বিভিন্ন অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক, সার্কাস, এবং মেলা। ‘দাদা মেলা থেকে বউ এনে দে’ গানটি বোধহয় বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে। পহেলা বৈশাখে হালখাতা খুলত দোকানদার। সারা বছরের দেনাপাওনা মিটিয়ে মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি ছিল রেওয়াজ। এখন গ্রামে সেই মেলা সে রকমভাবে আছে কি না জানি না তবে থাকলেও কি আগের মতো পান্তাভাত, ইলিশ মাছ কিংবা ভর্তা, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে উদরপূর্তি হয়? সম্ভবত না, কারণ সেই গ্রাম আর এই গ্রাম নয়। বদলে গেছে সব।
দুই. আবহমান বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ। আনন্দ শোভাযাত্রায় বাঙালি জাতির জীবনে একটি বৈচিত্র্যময় আনন্দঘন উৎসবমুখর দিন। ষড়ঋতুর এ দেশে বৈশাখ ঘরে ঘরে নিয়ে আসে অপার আনন্দ উৎসব। জাতির চেতনা উন্মোচনের এটি একটি বিশেষ দিন। গবেষকদের মতে, নববর্ষের সঙ্গে এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এক গভীর সম্পর্ক ছিল বহুকাল আগে থেকে। সরকার বাঙালির ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ পর্বের মতো বৈশাখকে বাঙালির জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উৎসবভাতা প্রদান করছে, যা জাতিকে তার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে ধরে রাখতে উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদান করছে বলে ধারণা করা হয়। ‘আমাদের দেশে বিভিন্ন উৎসব ও পালা-পার্বণকে সামনে রেখে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হস্ত ও কারুশিল্পের দোকানগুলোতে পড়ে গেছে কেনাকাটার ধুম। বৈশাখকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট শিল্প মালিক থেকে শুরু করে হস্ত ও কারুশিল্পীরা অনেক আগে থেকেই তাদের ব্যবসাকে চাঙ্গা করার নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। ফুটপাত থেকে শুরু করে অলিগলির দোকানপাট কিংবা বিলাসবহুল বিপণিবিতানে বৈশাখী পোশাক কেনাকাটার হিড়িক পড়ে। ফ্যাশন ডিজাইনাররা নতুন নতুন ডিজাইন দিয়ে শাড়ি, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জামা-কাপড়, পাঞ্জাবি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করে যা তাদের ব্যবসায়ে এক নুতন মাত্রা যোগ করে’।
তিন. প্রাপ্ত বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় যে, সুপার মার্কেটগুলোতে বিভিন্ন দোকানে বৈশাখী সাজসজ্জার উপকরণে বিশেষ ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের উৎসাহিত করছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটেছে। এ উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় অনলাইনে বৈশাখী পোশাকসহ বৈশাখী বিভিন্ন উপকরণ কেনাবেচার মধ্য দিয়ে। বড় বড় ব্র্যান্ড, করপোরেট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে তাদের গ্রাহকদের বৈশাখী শুভেচ্ছা জানায়। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে স্কুল-কলেজের মেয়েরা নতুন উদ্যমে কেনাকাটা করে। মাটির বাসনে পান্তাভাত, হরেক পদের ভর্তা, ইলিশভাজা, পাটশাক, শুঁটকি ভর্তা নিয়ে ছোট ছোট দোকানিরা দোকান সাজিয়ে তাদের ব্যবসাকে চাঙ্গা করতেই ব্যতিব্যস্ত থাকে। বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী গানের আসর বসে। শুধু তাই নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পালাগান, জারি গান, পুতুল নাচ দেখার জন্য পাগলপ্রায় শিশুকিশোর, আবালবৃদ্ধ। ছোট ছেলেমেয়েরা মেলা থেকে বাঁশের বাঁশি, তালপাতার বাঁশি, মাটির তৈজসপত্র ক্রয় করার ধুম পড়ে যায়। ‘বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে দেখা যায় বৈশাখ উপলক্ষে দেশ জুড়ে ২৪৫ থেকে ২৭০টি মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এসব মেলায় প্রচুর কেনাবেচা হয়। যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বাংলা নববর্ষ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়ে এটি আজ বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বৈশাখী মেলা প্রাচীনকাল থেকে গ্রামাঞ্চলে অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি আজ আর গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই।’
চার. কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে- ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী থাকলেও উৎসবের দিনে মানুষ হয়ে ওঠে বৃহৎ এবং মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব মহৎ।’ বাংলার এই উৎসবকে ঘিরে অন্য সময়ের চেয়ে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা ওঠানোর পরিমাণও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. মোয়াজ্জেমের মতে, প্রায় ৬০০ কোটি টাকার উৎসবভাতা পেয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এ বোনাসের কয়েকশ’ কোটি টাকা আসবে বৈশাখের বাজারে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া হিসাবে পহেলা বৈশাখ ঘিরে ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্য হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বছরে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করেছেন। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া এখন আর নাগরিক মধ্যবিত্তের রীতি নয়। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও পান্তা-ইলিশকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে নিয়েছেন। তাই এখন বৈশাখ ঘনিয়ে এলেই বাজারে ইলিশের দাম বাড়তে থাকে। অসাধু ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলে অবৈধ ইলিশের মজুদ। উৎসবকে ঘিরে এ অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নানা আয়োজনে সাজানো পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ পোশাক। কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর, নবাবপুরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি মার্কেটে এক মাস আগে থেকেই বৈশাখের পোশাক কেনাকাটা শুরু হয়েছে। সারা দেশের অর্ধেক বৈশাখী পোশাক তৈরি হয় কেরানীগঞ্জে। কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেটের ব্যবসায়ী ওসমান গণি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটসহ জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাইকাররা এখান থেকে বিভিন্ন ডিজাইনের বৈশাখী পোশাক নিয়ে যাচ্ছে। ইসলামপুরের আলম বলেন, পাইকারি বাজার হওয়ায় আমরা আগে বেচাকেনা শুরু করি, যাতে খুচরা বিক্রেতারা কিনে নিয়ে সময়মতো বিক্রি করতে পারে। প্রতিদিন কেরানীগঞ্জের একেকটি দোকানে দুই লাখ থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পাইকারি বাজার হলেও অনেকে এখানে খুচরা বিক্রি করেন। খুচরা বিক্রির জন্য এই এলাকার টং আকারের ফুটের দোকানগুলো বেশি জনপ্রিয়।
রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, কাঁটাবন, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, মিরপুর-উত্তরাসহ বিভিন্ন মার্কেটে ও শপিংমলগুলোতে দেদার বিক্রি হচ্ছে বৈশাখের এসব পোশাক। মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখের কেনাকাটায় তরুণ-তরুণী ও নারী ক্রেতাদের সংখ্যাই বেশি। মিরপুর বেনারসি পল্লীর ব্যবসায়ীদের কয়েকদিন ধরেই বেচাকেনা জমে উঠেছে। এখন গড়ে প্রতিদিন তাদের একশ’র বেশি শাড়ি বিক্রি হচ্ছে। সম্ভবত এই বৈশাখী মেলা কেন্দ্র করেই প্রতিমা মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান স্মরণ করিয়ে দেয় শৈশবের কথা‘আমি মেলা থেকে তাল পাতার/ এক বাঁশি কিনে এনেছি/ বাঁশি কই আগের মতো বাজে না/ মন আমার কেমন কেন সাজেনা/ তবে কি ছেলেবেলা/অনেক দূরে ফেলে এসেছি/আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক/ বাঁশি কিনে এনেছি...।’
পাঁচ. ছোটবেলার পহেলা বৈশাখ ঘিরে আনন্দ উৎসব সম্ভবত আগের মতো নেই। এর কারণ গ্রামগুলো আর আগের মতো নেই। ২০২৫ সালে গ্রামবাংলায় পা ফেলেই যেন ধাঁধায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কৈশোরে পাঠ্যপুস্তকে পড়া কিংবা দুই-তিন যুগ আগের দেখা গ্রাম আর বর্তমান গ্রামের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ পার্থক্য। এই গ্রাম তো ঠিক সে-ই গ্রাম নয়। পানির কলকল ধ্বনি, বর্ষার জলে টইটম্বুর নদী ও পুকুর, পাখির কলরব, সারি সারি ছনের ঘর, কুপির টিমটিমে আলো ইত্যাদি তেমন আর চোখ পড়ল না। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ এখন ভরাট হয়ে সোজাসুজি চলছে। মাঠের ধুলাবালিতে গড়াগড়ি, গাছের ডাল থেকে দুঃসাহসিক লাফ, পুকুরে দাপাদাপি ও পানির খেলায় মেতে ওঠার ‘মহোৎসব’ আগের মতো মূর্তিমান নেই; ঐতিহ্যবাহী হাডুডু, গোল্লাছুট এমনকি এক্কা-দোক্কা খেলা আধুনিকতার ধাক্কায় যেন কুপোকাত। পতিত জমিতে পাজামা, পাঞ্জাবি এবং টুপি পরা মাদ্রাসার ছাত্র কিংবা খালি গায়ে একদল শিশু ক্রিকেট খেলছে। গ্রাম থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে পহেলা বৈশাখের মেলা, যাত্রাপালা, জারিগান ও পুঁথিপাঠ।
ছয়. মোট ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকার বৈশাখী অর্থনীতি সবার জন্য আনন্দের, সবাইকে পহেলা নববর্ষ তথা বৈশাখের শুভেচ্ছা।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
