আজ ১৪ এপ্রিল। পহেলা বৈশাখ, ১৪৩২; উদযাপিত হবে বাংলা নববর্ষ। ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’ এ প্রতিপাদ্যে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত সারা দেশ। ছায়ানটের শিল্পীরা রমনা বটমূলে সুরের মাধুরীতে বরণ করবেন নতুন বছরকে। সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে বের হবে আনন্দ শোভাযাত্রা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বানী....................
বর্ষবরণ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা অনুষদে (চারুকলা ইনস্টিটিউট) নির্মিত হয়েছে নানা থিমের মুখোশ, আলপনা ও শোভাযাত্রার বিভিন্ন অনুষঙ্গ। সাম্প্রতিক নাশকতায় পুড়ে যাওয়া ‘স্বৈরাচারের প্রতিকৃতি’ পুনরায় নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন শিল্পীরা।
রবিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে চারুকলায় নির্মিত হয়েছে প্রধান মঞ্চ। মঞ্চের সামনে ঝোলানো হয়েছে রঙিন বেলুন, আর পেছনে তৈরি হচ্ছে পাটকাঠির ব্যাকড্রপ। প্রতিটি উপাদানে রয়েছে রঙ, ছন্দ আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধন।
আনন্দ শোভাযাত্রায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ১৮টি ঘোড়া অংশ নেবে। শিশুদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, খেলনা, মিনি ট্রেন ও জাম্পিংয়ের আয়োজন।
এবারের শোভাযাত্রায় কেন্দ্রীয় মোটিফ হিসেবে রাখা হয়েছে ‘স্বৈরাচারের প্রতিকৃতি’। এ প্রতিকৃতি সম্প্রতি আগুনে পুড়ে গেলেও শনিবার রাতে এর পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে শিল্পীরা।
এছাড়া, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে ‘পানি লাগবে’ থিমের ১৫ ফুট উচ্চতার একটি পানির বোতল। এ বোতলের ভেতরে থাকবে একাধিক খালি বোতল, যেগুলো শহিদদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
শোভাযাত্রায় আরও থাকছে ইলিশ মাছ, কাঠের তৈরি বাঘ, শান্তির প্রতীক পায়রা, পালকি, ঘোড়া, নানা পাখির মোটিফ, সুলতানি ও মুঘল আমলের মুখোশ, রঙিন চরকি, তালপাতার সেপাই, পটচিত্র ও অন্যান্য শৈল্পিক উপস্থাপনা।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশে এবার তরমুজের মোটিফও রাখা হয়েছে। প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত তরমুজের বাইরের সবুজ রঙ এবং ভেতরের লাল, সাদা ও কালো রঙ ফিলিস্তিনের পতাকার রঙের প্রতিফলন। এটিই এবার শোভাযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী ও ভাস্কর্যশিল্পী দীপক রঞ্জন সরকার বলেন, ‘শনিবার রাতে ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে নির্মিত ‘দৈত্য মুখ’ পুড়িয়ে দেওয়ায় কিছু ক্ষতি হয়েছে। আমরা তা পুনর্গঠন করছি। মাছ, বাঘ, তরমুজের ফালি, পালকি ও মুগ্ধের পানির বোতল’সহ বেশ কয়েকটি থিম সম্পন্ন হয়েছে। পুড়ে যাওয়া ‘৩৬ শে জুলাই’ ও ‘শান্তির কবুতর’ মোটিফেরও পুনর্র্নির্মাণ চলছে।’
আনন্দ শোভাযাত্রায় যা যা থাকবে
নববর্ষের দিন সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হবে মূল শোভাযাত্রা। এটি শাহবাগ, টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ মিনার, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র, দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে। এতে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বার্তা তুলে ধরা হবে।
এতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাউল শিল্পী, ব্যান্ডদল, নারী ফুটবলার, রিকশার র্যালি থাকবে, ঘোড়ার গাড়িও থাকবে এবং নানা পেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। শোভাযাত্রার সম্মুখভাগে থাকবে পুলিশের আটটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি।
বন্ধ থাকবে মেট্রোরেলের টিএসসি স্টেশন
নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলামোটর, বারডেম, আজিজ সুপার মার্কেট ও মৎস্য ভবনের রাস্তাগুলো শোভাযাত্রার সময় বন্ধ থাকবে। নীলক্ষেত ও পলাশির দিক খোলা রাখা হবে। মেট্রোরেলের টিএসসি স্টেশনও বন্ধ রাখা হবে। বিকেল ৫টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে, শুধু বের হওয়ার পথ খোলা থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন বলেন, ‘শোভাযাত্রা সফল করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
চৈত্র সংক্রান্তির যত আয়োজন
গতকাল রবিবার ছিল বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তি। পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণের দিন হিসেবে এ দিনটি পালিত হয়। এ উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে ছিল নানা আয়োজন। ছিল ঘুড়ি উৎসব; ছোট-বড়, শিশু-কিশোর, সব বয়সী মানুষ ঘুড়ি ওড়াতে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। চারুকলার বকুলতলায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও যাত্রাপালা।
শোভাযাত্রায় এলোমেলোভাবে ঢোকা যাবে না: রমনা বটমূলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড়, টিএসসি, শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি, টিএসসি হয়ে পুনরায় চারুকলা এগিয়ে শেষ হবে। শোভাযাত্রা পুরো রুট নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে। এলোমেলোভাবে শোভাযাত্রায় ঢোকার সুযোগ নেই।
নিরাপত্তার ঝুঁকি নেই
ডিএমপি কমিশনার বলেন, নববর্ষ উদযাপনে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি নেই। ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে। সঙ্গে র্যাব, বাংলাদেশ আর্মি ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিট থাকবে। অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও সহযোগিতা করবে। শোভাযাত্রায় কোনো ধরণের ঝুঁকি নেই।
তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ডগ স্কোয়াড দ্বারা সুইপিং করা হবে। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ মোট ২১টি স্থানে ব্যারিকেড থাকবে। প্রতিটি অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের মুখে আর্চওয়ে থাকবে এবং হ্যান্ড মেটাল দিয়ে তল্লাশি করা হবে। অনুষ্ঠানস্থল ও শোভাযাত্রার রোডগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ স্থির ও ভিডিও ক্যামেরা এবং ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করা হবে। অনুষ্ঠানের চারপাশে পর্যাপ্ত ফুট পেট্রোল থাকবে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা থাকবে।’
র্যাবের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন
গতকাল রমনার বটমূলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান ঘিরে র্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীটির মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘নববর্ষের অনুষ্ঠান ঘিরে সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। সব জায়গায় র্যাবের নিরাপত্তা বলয় থাকছে।’
মোটিফে আগুন দেওয়া যুবক ঢাবির আরবি বিভাগের ছাত্র
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শোভাযাত্রার জন্য তৈরি করা ‘ফ্যাসিস্টের প্রতিকৃতিতে’ আগুন দেওয়ার ঘটনায় সিসিটিভি ভিডিওতে মাস্ক পরা যে যুবককে দেখা গেছে, তিনি আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগ কর্মী বলে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের ধারণা।
তিনি মাস্টারদা সূর্যসেন হলের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে আর হলে দেখা যায়নি।
চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ‘এক যুবক দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে আগুন লাগিয়ে একইভাবে চলে যায়। আমরা সিসিটিভি ফুটেজে একজনকে দেখেছি। তার পরনে ছিল কালো রঙের টিশার্ট এবং মুখে মাস্ক।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘নববর্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা উপলক্ষে নির্মিত স্বৈরাচারের মুখাবয়ব মোটিফে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা আশা করছি শোভাযাত্রা শুরুর আগেই সন্তোষজনক সুসংবাদ আসবে।’
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতার ব্যাখ্যা দাবি শিক্ষার্থীদের
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তারা আয়োজক কমিটির কাছে এই নাম পরিবর্তনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। গতকাল রবিবার চারুকলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা অসন্তোষ কাশ করেন এবং শোভাযাত্রা আয়োজনের দায়িত্বশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানান। তারা এ-ও জানান, আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই দ্বন্দ্বের সমাধানে তারা প্রস্তুত।
সংবাদ সম্মেলনে চারুকলার প্রিন্ট মেকিং বিভাগের শিক্ষার্থী জাহরা নাজিফা বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। কিছু পক্ষ নাম পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে, যা ইতিহাসসন্ধানী নয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে বৈশাখের পর, জুলাইয়ে। কাজেই ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা ভুল। যে সিনেট সভায় নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখানে আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। অথচ এই আয়োজনে শিক্ষার্থীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।’
প্রাক্তন শিক্ষার্থী জাহিদ জামিল বলেন, ‘সম্প্রতি আয়োজকদের সঙ্গে আমাদের বৈঠকে ডিন বলেছিলেন, নাম অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু পরে অজুহাত দেখিয়ে নাম বদলে ফেলা হয়েছে যা অপ্রত্যাশিত।’
শিক্ষার্থীরা বলেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং একটি যৌথ নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
কারাবন্দিদেরও বর্ষবরণের বিশেষ আয়োজন
নববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশে কারাগারে থাকা ৬৮ হাজার কারাবন্দির জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যেগ। তাদের পান্তা-ইলিশ-বিভিন্ন রকম ভর্তা খেতে দেওয়া হবে। আয়োজন করা হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে বাংলা সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলবেন কারাবন্দিরাই। বিভিন্ন কারাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ষবরণে বের করবেন বর্ণাঢ্য র্যালি। বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন স্বজনরা।
সাক্ষাতকারীদের দেওয়া হবে বৈশাখ বরণের ফেস্টুন ও হাতপাখা। কারাবন্দিদের পান্তা ইলিশের পাশাপাশি পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, চমচম, দই, পান-সুপারি দেওয় হবে। গতকাল সন্ধ্যায় কারা অধিদফতরের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
