সংস্কার নিয়ে সিরিয়াস বলেই বিএনপি ঐকমত্য তৈরি করতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, এ মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দফাওয়ারি আলোচনা হচ্ছে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছি আমরা। এসব নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা চলছে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলাপের পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
বৈঠকে বিএনপির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটি সদস্য নজরুল ইসলাম খান। অন্য সদস্যরা হলেন স্থায়ী কমিটি সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সাবেক সচিব মনিরুজ্জামান।
এদিকে গতকাল দিনব্যাপী বৈঠকের পর ঐকমত্য কমিশন ও বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনা শেষ হয়নি। আগামী রবিবার আবারও ঐকমত্য কমিশন ও বিএনপির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। সংলাপের শুরুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি জাতীয় সনদ তৈরি করা, যা বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।’
আলী রীয়াজ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিএনপির একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে এ দলটি দাবি উত্থাপন করেছে, কর্মসূচি দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিএনপি। সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সামনে অগ্রসর হতে চাই আমরা। সুপারিশগুলো আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়েছিলাম, এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি আন্তরিকভাবে, সুচিন্তিতভাবে তাদের মতামত জানিয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের দায়িত্বপালনকালে বিএনপির সহযোগিতা পেয়েছি। এজন্য আন্তরিকভাবে তাদের ধন্যবাদ জানাই।’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিএনপি সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়। আমরা বরং একটি সংস্কারমুখী রাজনৈতিক দল।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি ইতিমধ্যে ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে, যা দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার প্রতিফলন।’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা কালকেও প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি, দেশে বিএনপির চেয়ে বেশি সংস্কার কোন রাজনৈতিক দল করেছে? গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা তো বিএনপিই করেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র তো বিএনপিই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে; সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তো বিএনপিই প্রতিষ্ঠা করেছে।’
বৈঠকে নজরুল ইসলাম বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতি বিএনপি চালু করেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন বিএনপি গঠন করেছে। তিনি বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত হলো ভ্যাট, এটাও বিএনপি করেছে। অর্থনীতির মূল স্তম্ভ পোশাক খাত বিএনপির হাতে হয়েছে। কৃষি উন্নয়ন, প্রবাসী কর্মসংস্থান, পল্লীবিদ্যুতায়ন থেকে শুরু করে সমবায় উন্নয়ন, কুটির শিল্প সবই বিএনপির হাতে হয়েছে। বিএনপি সংস্কারের বিপক্ষে নয়, বিএনপি সংস্কারেরই দল।’
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, বদলাবেই। এ কারণেই বলছি, সংস্কার একটা চলমান অনিবার্য প্রক্রিয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভালো করার জন্য আমরা এত সময় যেন না নিই, তাহলে মানুষের পরিবর্তনের যে আকাক্সক্ষা সেটা স্তিমিত হয়ে যাবে। নিশ্চয় আমরা ভালো করতে চাই এবং ভালো করার প্রয়াস অব্যাহত থাকবে, সব সময় থাকবে। তারপরও কেউ কেউ বিরুদ্ধ কথা বলবে, তারা যখন সংস্কারের “স” উচ্চারণ করেনি, তখন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ভিশন ২০৩০ দিয়েছেন। কেউ যখন সংস্কারের কথা ভাবেইনি, তখন শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছেন।’
বৈঠকের পর সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, কমিশনের ১৩১টি প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপি ২৫টির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, প্রায় ২৫টি প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিক একমত; বাকি প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সংস্কারের বিষয়ে সিরিয়াস। তবে কমিশন যে সংক্ষিপ্ত হ্যাঁ/না উত্তরের স্প্রেডশিট সরবরাহ করেছে, তা বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তব আলোচনার পরিপন্থী।’ তিনি জানান, বিএনপি সংবিধান, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তাব দিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্রের মূলনীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ৯৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই। আজ না হলেও পরে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩৯টি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঁচটি সংস্কার প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং ৩৪টি দল এরই মধ্যে তাদের মতামত দিয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের সংলাপ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে চায় তারা।
