সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ তিন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রাখার বিষয়ে মত দিয়েছে বিএনপি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে তৃতীয় দিনের বৈঠকে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন সুপারিশের বিষয়ে নিজেদের মত জানায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আলোচনার বিরতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে বিএনপির সঙ্গে কমিশনের গত বৃহস্পতিবার প্রথম দফা এবং রবিবার দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয়।
এদিন বৈঠকের শুরুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি জানান, ইতিমধ্যে যে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে এবং প্রত্যেকটা বিষয়ে তিনি দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিএনপির সঙ্গে প্রথম পর্যায়ের আলোচনায় যেসব সুপারিশ ঐকমত্য কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কমিশন থেকে পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে, আবার কিছু বিষয়ে মতের ভিন্নতাও রয়েছে। বিএনপি থেকে জানানো হয়েছে যে সব বিষয়ে মতভিন্নতা আছে তার অনেকগুলো বিষয়ে তাদের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং আমাদের জানাবেন। তিনি আরে বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সন্ধিক্ষণে আছি। সুপারিশমালার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র এই টেবিল থেকে হতে পারে না। কারণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকরা নিঃসন্দেহে অংশগ্রহণ করবেন।
এদিকে বৈঠকের মাঝখানে বিরতিতে এসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, সাংবাদিকদের এই ইস্যুতে কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বাধ্যবাধকতা চায় বিএনপি : বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ তিন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে বলে মনে করে দলটি।
রাষ্ট্রপতি অভিশংসন ও ন্যায়পাল বিষয়ে একমত : রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে, ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাবেও দলটি সম্মতি জানিয়েছে।
সংবিধানের পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান : সংস্কার কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশের সঙ্গে বিএনপি একমত এ কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা সংবিধানের অষ্টম, নবম, দশম, দ্বাদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে। ধর্মনিরপেক্ষতার বিলোপ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিও জানানো হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বিলুপ্ত করার সঙ্গে বিএনপি একমত। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার আনার ক্ষেত্রেও তারা একমত। এগুলো মৌলিক অধিকারে আনার কথা বলেছে বিএনপি।
এক ব্যক্তি টানা দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয় : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একজন ব্যক্তি টানা দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। পরপর দুই মেয়াদের পর অন্তত এক মেয়াদ বিরতি দিতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হবেন কি না সে বিষয়ে দলের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। বিএনপি মনে করে, সংসদ নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান থাকা উচিত, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী একই ব্যক্তি হবেন কি না তা নির্ধারিত হওয়া উচিত।
দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন : বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার সুপারিশের সঙ্গে একমত হয়েছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় প্রশাসনের চারটি বিভাগীয় কাঠামোর প্রস্তাবেও দলটির সম্মতি রয়েছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাবে সম্মতি : বিএনপি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষে ৪০০টি আসন থাকবে যার মধ্যে ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত হবে। উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০টি আসন।
প্রথম পর্যায়ে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর ওপর রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট মতামত জানাতে অনুরোধ করে সুপারিশগুলোর স্প্রেডশিট আকারে ৩৯টি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩৫টি দলের কাছ থেকে মতামত পেয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গত ২৩ মার্চ তাদের প্রস্তাবনা কমিশনে জমা দেয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার এবং রবিবার দলটির সঙ্গে দুই দফায় আলোচনায় বসে কমিশন। এ পর্যন্ত ১৫টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা শেষ করেছে ঐকমত্য কমিশন।
মে দিবসে শ্রমিক সমাবেশ করবে বিএনপি
মহান মে দিবস পহেলা মে নয়া পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশ করবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যৌথ সভার পর এক সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ কথা জানান।
নজরুল বলেন, ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম বাংলাদেশি শ্রমিক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আগামী পহেলা মে ঢাকায় বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহান মে দিবসের সমাবেশ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটি কয়েকবার বসেছে, আলোচনা করেছে, সমাবেশ উদযাপন কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আমন্ত্রণে বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি।’
তিনি জানান, সমাবেশ শুরু হবে বেলা ২টায়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সমাবেশে ঢাকাসহ তার আশপাশের জেলাগুলো থেকে শ্রমিকরা অংশ নেবেন। ঢাকা ছাড়া সব বিভাগ মহানগর এবং জেলায় আলাদা আলাদাভাবে স্থানীয় শ্রমিক দলের উদ্যোগে মে দিবসের অনুষ্ঠান হবে।
এর আগে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এই যৌথসভা হয়। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ছাড়াও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, এমরান সালেহ প্রিন্স, শ্রমিক দলের সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন কবীর খান, ফিরোজ উজ জামান মামুন মোল্লা, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমিনুল হক, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুব দলের এম মোনায়েম মুন্না, নুরুল ইসলাম নয়ন, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, জাসাসের হেলাল খান প্রমুখ নেতারা অংশ নেন।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ হলে জাতীয়তাবাদী নবীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা ও হাসিনা সরকারের আমলে গুম, খুন ও অপহরণে জড়িতদের বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, ‘ড. ইউনূস আপনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। গ্রামের মানুষের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক করে ইতিহাস সৃষ্টি করে নোবেল পেয়েছেন। সেই নোবেলকে নিয়েও হাসিনা পার্লামেন্টে বাজে কথা বলেছিল।
