বড় দলের ভোটে ভাগ বসাতে ছোট ছোট দল

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৫৫ পিএম

জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই চলছে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ। প্রায় প্রতিদিন কয়েকজন মিলে রাজনৈতিক দল ঘোষণার খবর আসছে। গত কয়েক মাসে অন্তত ২৭টি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের খবর পাওয়া গেছে। মূলত দুই কারণে ছোট রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটছে নির্বাচনে বেশিসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ দেখানো ও বড় রাজনৈতিক দলের ভোটে ভাগ বসানো।

জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য নির্বাচনে বেশিসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সরকারের নির্বাচনকেন্দ্রিক এ মনোভাব টের পেয়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করছে। সর্বশেষ নিবন্ধন পাওয়া দলসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫০টি। সমাজে কিছুটা চেনাজানা আছে এমন কয়েকজন মিলেই একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করছে। এটা অনেকটা ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ কথার মতো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে নিজেকে প্রচার করার মনোবাসনা রয়েছে অনেকেরই। ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষা করার জন্যই এত এত রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটছে। তাদের অভিমত, ছোট দল দিয়ে বড় দলের ভোটে ভাগ বসানোও একটি কৌশল হয়ে থাকতে পারে। বেশি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সরকারি লক্ষ্যও এর কারণ হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলেন, এ ক্ষেত্রে নানা শক্তির ইন্ধন রয়েছে। ফলে, কিন্তু তো একটা আছেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল আসছে তাদের সবার আমি কম কীসে?’ এতে রাষ্ট্রীয় নানা শক্তির ইন্ধন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সুষ্ঠুধারা না থাকার কারণে একেকজন একেকটা দল খুলে বসে আছেন। গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসলে নব্য দলগুলো হারিয়ে যাবে। কয়েকজন মিলে একটা রাজনৈতিক দলের জন্ম দেওয়া একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এতে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে।’

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নেতৃত্বে ‘জনতার পার্টি বাংলাদেশ’ নামের দল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক পার্টি, ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, সমতা পার্টি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি (বিপিপি), সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ মুক্তির ডাক ৭১, বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি), জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ, দেশ জনতা পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএসডিপি), বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জনতার বাংলাদেশ পার্টি, জনতার দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও আমজনতা পার্টি (বিএজেপি)। নতুন দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে এনসিপি। দলটি এখনো নিবন্ধন পায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি নামক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে দলটি তৈরি হয়েছে।

নতুন ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ও তৈরি হয়েছে। এনসিপি গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসা শিবিরের সাবেক নেতাদের নতুন সংগঠন ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ’-এরও এ মাসের মধ্যেই আত্মপ্রকাশের কথা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত রাজনৈতিক দল কেন আসছে? কাদের ইশারায় আসছে? কাজইবা কী? শেষ পর্যন্ত অস্তিত্ব থাকবে তো এসব দলের? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে নানা কৌশলের কথা। তার একটি হলো, বেশিসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ দেখিয়ে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করে তোলা। নির্বাচন উৎসবমুখরও করা। জানা গেছে, ফ্যাসিস্টখ্যাত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি এ প্রশ্ন যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে উড়িয়ে দেওয়া যায়, সেজন্যই নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম হচ্ছে। সরকারসংশ্লিষ্ট নানা মহলের ইশারাও রয়েছে এখানে।

সিপিবি নেতা শাহ আলম দাবি করেন, এনসিপি সরকারের মদদে হয়েছে। তরুণ সমাজের মধ্যে নতুনরূপে নৈরাজ্য যে চলছে তার প্রকাশ এর মধ্য দিয়ে ঘটছে। এর উদ্দেশ্য ছোট ছোট দল দিয়ে বড় দলের ভোট ভাগ করা। বড় দলের আসন কমানোও এসব দলের জন্মের পেছনের কারণ হয়ে থাকতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন-চারটি কারণে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটছে। কেউ নিজের পরিচয় জাহির করতে চায়। কেউ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় দল গঠন করছে। কেউ মনে করে, রাজনৈতিক দল করতে পারলে বড় দলের সঙ্গে আঁতাতের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সে সুবাদে সরকারের অংশ হয়ে যাওয়ার সুযোগ চলে আসতে পারে। কেউবা জনসেবার মানসিকতায় রাজনৈতিক দল গঠন করছেন।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রধান হলে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, এটাও অনেকের ভাবনায় থাকে। নতুন রাজনৈতিক দল নিশ্চয়ই দরকার। এটি ইতিবাচকও। ভিন্ন উদ্দেশ্য-স্বার্থ মাথায় নিয়ে দল গঠন মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে না। নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন দেওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি করবে বলে বদিউল আলম আশা করেন।

২০২৩ সালে যেসব দলকে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। কমিশন তার প্রতিবেদনে আউয়াল কমিশনের সময়ে ‘তৃণমূল বিএনপি’, ‘ইনসানিয়াত বিপ্লব-বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম’ এবং ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি’র নিবন্ধন নিয়ে অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করেছে। তদন্তসাপেক্ষে সেগুলোর নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করেছে ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন।

জানতে চাইলে ড. তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘সময়-সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন দোকান খোলা হচ্ছে। আরও কত দোকান খোলা হয় দেখা যাক। এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’

১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করা হলেও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিবন্ধনের জন্য ১১৭টি আবেদন পড়ে। শর্তসাপেক্ষে ৩৯টি দল নিবন্ধন পায়। পরে আরও ১৬টি দল নিবন্ধন পায়। শেখ হাসিনার সময়কালে ১০টি ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৬টি দল নিবন্ধন পেয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত