যানজট ব্যাটারিরিকশা স্বেচ্ছাচার 

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৫০ এএম

একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে যানজট। এখন রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ (!) ব্যাটারিচালিত রিকশা। অলিগলি থেকে শুরু করে মূল রাস্তায় এসব রিকশার দাপট থাকলেও এই বাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু ঢাকা নয়, পুরো দেশের জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নসহ গ্রাম পর্যায়েও চলছে তাদের দাপট। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের ঔদ্ধত্যের পেছনে রয়েছে নীরব চাঁদাবাজি। প্রতিমাসে এসব রিকশা থেকে ঢাকাসহ দেশে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। বিশেষ টোকেনের মাধ্যমে স্থানীয় নেতা ও প্রশাসন ম্যানেজ করে চলছে এসব রিকশা। মূলত টাকার ভাগ আর কারা পাচ্ছে? কেন ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে সব সরকার? অথচ কঠিন ছিল না এসব রিকশাচালককে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। উপযুক্ত ট্রেনিং নিয়ে কারা চালাবে, কোথায় চলবে, কোত্থেকে সংগ্রহ হবে বিদ্যুৎ এসব বিষয় সুরাহা না করে রাস্তা দখলের প্রতিযোগিতা কোন সাহসে তারা করছেন, এটাই বড় প্রশ্ন। এমনটি ভাবার কারণ নেই, নেপথ্যে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক শক্তি অনুপস্থিত! এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা শহরের যেকোনো এলাকায় এসব যান চলাচলের অনুমতি বন্ধ। যদিও খুলনা এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও কিছু পৌরসভা অল্পসংখ্যক অটোরিকশার নিবন্ধন দিয়েছে।

যানজট সমস্যা দীর্ঘদিনের। অলিগলিসহ ভিআইপি রাস্তায় যানবাহন আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যত্রতত্র পার্কিং, যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, ফুটপাত দখল, গাড়ির তুলনায় রাস্তা সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা না থাকা, আইনের বাস্তবায়ন না হওয়া, রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা স্থাপন এবং অফিস-আদালত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার ফলে যানজট তো আছেই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। দেশে ৫০ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। খোদ রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ৮ লাখ। এসব যানবাহনের ব্যাটারি রিচার্জ করতে বেশিরভাগ চালক ও মালিক ব্যবহার করছেন আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ লাইন। আবার শহরের বাইরে বেশ কিছু এলাকায় এসব চার্জ দিতে ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন তৈরি করে শুরু হয়েছে নতুন এক ব্যবসা। চার্জিং স্টেশনের অনেক মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর ২০১৭ সালে এসব পরিবহন বন্ধে আরেক দফা নির্দেশনা আসে হাইকোর্টের। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর অটোরিকশা বন্ধ ও আমদানি নিষিদ্ধ করে আবারও নির্দেশনা দেয় হাইকোর্ট। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ২০ জুন এসব রিকশা-ভ্যান বন্ধের নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশন এগুলো বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু এরপর তাদের সংখ্যা না কমে বরং বাড়তে থাকে! বর্তমান সরকারের সময়ও এসব বন্ধের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। 

দেশের ৯০ শতাংশ গ্যারেজে নিষিদ্ধ এসব অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন। অনেক স্থানে চলছে মিটার টেম্পারিংয়ের মতো ঘটনা। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কোনো সংস্থা। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। সবাই কমবেশি জানেন, বোঝেন। ডে-লেবার থেকে শুরু করে কিশোর পর্যন্ত অটোরিকশা চালক। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।  যে কারণে আরও বেপরোয়া অটোরিকশা চালকরা। একদিকে রিকশাগুলোতে ব্যাটারি চার্জের নামে দেদার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ এ যানবাহনকে পুঁজি করে চলছে চাঁদাবাজি। সরকার চুপ করে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অটোরিকশাকে দ্রুত নীতিমালার মধ্যে আনতে না পারলে যানজটে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে রাজধানী। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হবে, আহত হবেন হাজার হাজার। অটোরিকশাকে যদি রাখতে হয়, যানজট আরও বাড়াতে না চাইলে অনতিবিলম্বে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা করে, চালকদের নীতিমালা অনুসরণ করে এই যানটি চালাতে হবে।  লোডশেডিং থেকে মুক্তি, সড়কে ব্যাটারিরিকশার অত্যাচার থেকে বাঁচতে যানজট থেকে মুক্তি চাইলে, এর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত