জনগণ বিদ্যুৎ পাক সাশ্রয়ী মূল্যে

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদু্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ চলতি মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের জন্যও সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১ ও ২- উভয় ইউনিট পুরোদমে চালু হলে, রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর ফলে পাওয়া বিদ্যুৎ দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে কোন ধরনের ভূমিকা রাখবে এটিই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ, অতীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য সবাই জানেন। ভয়ংকর দুর্নীতি ছেয়ে ফেলেছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে। তখন পরিবহন খরচসহ প্রতিটি বালিশের পেছনে অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো হয়। বিশেষ করে, একটি বালিশের দাম দেখানো হয়েছিল ৮৯,৯০০ টাকা। সেখানে ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে মোট ৫.৪১ কোটি টাকা বিল করা হয়, যার প্রকৃত মূল্য ছিল ১.৪৮ কোটি টাকা। তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৩০ জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ৪ জনসহ মোট ৩৪ জন কর্মকর্তার দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল। অবশ্য এর পরিণতি কী হয়েছিল, সেটি আমাদের জানা নেই। তবে এখন পুরোদমে কাজ চলছে। কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কি কমবে? এটিই কিন্তু আসল প্রশ্ন। সেইসঙ্গে প্রশ্ন আসে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে না ফেলে, একইভাবে অগ্রসর হলে আমাদের লাভ হবে কতটুকু?

তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে পারলে, এই খাতে প্রকৃত স্বস্তি ফিরে আসবে। এর ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সরকারের পলিসিতে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু অতীতে যে ধরনের দুর্নীতি, অপচয় ও অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে তাতে করে বিদ্যুতের মূল্য সাশ্রয়ী হবে কি-না, সেই বিষয়ে আশঙ্কা রয়েছে। পামাণবিক বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এখনো অনেক কিছু পিডিবির কাছে গোপন রেখেছে। যদিও পিডিবি তাদের একক ক্রেতা। এই বিষয়টি অনেকের কাছেই রহস্যজনক। কী এমন কারণ রয়েছে, তা আমরা জানি না। আদৌ কোনোদিন জানব কি-না, তাও নিশ্চিত নই। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ১২ টাকা ৩৪ পয়সা। কিন্তু এখানে অনেক কম হওয়ার কথা। যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল, ৬ টাকা করে এই বিদ্যুৎ পাওয়ার, সেখানে সরকারকে এখন কত দামে কিনতে হবে এখনো তা নিশ্চিত নয়। এর ফলে বিস্তারিত জানার আগে বলা যাবে না, এর ফলে ভোক্তাদের ওপর কতটা চাপ কমবে কিংবা আদৌ কমবে কি-না। পরিকল্পনা ছিল বিদ্যুতের মূল্য সাশ্রয়ী হবে, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে। কিন্তু সত্যিকারভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের সাধারণ মানুষ এই বিদ্যুৎ পাবে কি-না, তা আমরা নিশ্চিত নই। মনে রাখতে হবে, এখানে ঘাটতি পূরণ বড় কথা নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও জ¦ালানি না থাকার কারণে, বিভিন্ন জায়গায় বাধ্যতামূলকভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা থেকেই যাচ্ছে। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কেমন খরচ পড়বে, সাধারণ মানুষ কী পরিমাণ মূল্যে এই বিদ্যুৎ পাবেন তা এখনো জানা যায়নি।  ধারণা করা যায়, এর ফলে আমরা লাভবান হব। তবে মূল্য বেশি হলে, আমরা কতটা লাভবান হব সেটা ভবিষ্যতে বলা যাবে। সার্বিক বিবেচনায় এই মুহূর্তে খরচের কথা বলা যুক্তিসংগত হবে না। তবে আমরা লাভবান হব, এটা অনুমান করা যায়। এরই মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। প্রকৃতভাবে এটা বোঝা যাবে তখন, যখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কত হলো। সেই অনুপাতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারিত হবে। তবে এটা মনে রাখা ভালো উৎপাদন ব্যয় বাড়লে, বিদ্যুতের দাম কম রাখার সুযোগ তেমন থাকবে না। বিদ্যুতের অন্যান্য প্রকল্পে যেভাবে ভর্তুকি দিয়ে চালানো হচ্ছে, এখানেও পরিস্থিতি একই হলে সাধারণ ভোক্তাদের সুবিধা তেমনটি নাও হতে পারে। ইতিমধ্যে বিদ্যুতের দাম নিয়ে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। একই অবস্থা যদি এখানেও হয়, তাহলে তো লাভের গুড় পিপড়া খাবে। বলা ভালো, লাভের গুড় রসাতলে গেল। তবে দাম ৬ টাকা বা আশপাশে হলে নিশ্চিত বলা যায় আমরা উপকৃত হব। পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের যেমন বিশাল প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন কারণে আশঙ্কাও কম নয়।  মনে রাখতে হবে, এই প্রকল্পে অতীতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। সেই টাকার কোনো হদিস নেই। সরকার কোনো অর্থ এখন পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে পারনি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় করা অর্থ দুর্নীতির অর্থ দিয়ে সমন্বয় করলে, এটি হবে সুবিধা নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, পূর্বে দুর্নীতির কাঠামোকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। দুর্নীতি হওয়ার কাঠামো এখনো প্রতিষ্ঠিত, সেই কাঠামোকে আগে ভাঙতে হবে। এর মানে, যে মানুষ দায়িত্ব পাবেন তিনিই দুর্নীতির স্রোতে ভেসে যাবেন। মনে রাখতে হবে, এখানে কিন্তু বিগত সরকার দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছে। এই কারণে বলছি, দুর্নীতির কাঠামোকে আগে ভাঙতে হবে। যাতে এর সুফল সাধারণ জনগণ পেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দুর্নীতি না হলে তো বিদ্যুতে ঘাটতি মেটানো সম্ভব। শুধু তাই না, তাহলে তো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দরকারই ছিল না। একই অবস্থা যদি এখনো চলে, তাহলে বিষয়টি কতটুকু উপকারে আসবে তা নিশ্চিত নই। এখন পর্যবেক্ষণ করতে হবে, সরকারের নীতি-কৌশল কোনদিকে অগ্রসর হয়। সঠিক এবং কঠোর সিদ্ধান্ত না হলে যা হচ্ছে তাই হবে, কেউ কিছু করতে পারবে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পেলে অবশ্যই আমরা উপকৃত হব। 

লেখক : জ¦ালানি উপদেষ্টা

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

অধ্যাপক ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত