অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের অভিযোগে পুলিশের সুবিধাভোগীদের বিষয়ে আবার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত যারা ভালো ইউনিটে কর্মরত ছিলেন, তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে নতুনভাবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সে রকম একাধিক কর্মকর্তা আগের মতো ভালো অবস্থানেই বহাল আছেন। তারাই তথ্য পাচার করছেন বলে পুলিশের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। সরকারবিরোধী লোকজনের কাছে পুলিশের গোপন তথ্য পাচারের খবর পাওয়ায় উদ্বিগ্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ কারণে অতিরিক্ত আইজিপি থেকে এসআই পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার কর্মকর্তার বিষয়ে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে কারা বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, কারা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দায়িত্ব পালনে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন এবং কারা গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক তথ্য বাইরে সরবরাহ করছেন তাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে। পুলিশ বাহিনীর মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে গোপন তথ্যের অপব্যবহার, তদন্তের খবর আগাম জানিয়ে দেওয়া বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য বাইরে পাচারের অভিযোগকে গুরুতর হিসেবেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা অতীতে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাকালে কার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কারও জন্য বিশেষ সুবিধা নিচ্ছেন কি না এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
২০২৪-এ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশে রদবদল ও পদোন্নতির হিড়িক পড়ে। তৎকালীন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে দমনপীড়ন চালায় পুলিশ। ওই সময়ে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ প্রায় ৮০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত অনেকের বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে। আবার অনেক কর্তা ‘আত্মগোপনে’ আছেন। পরে আইজিপিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটে শীর্ষ পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাহারুল আলমকে আইজিপি ও শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়। দুজনই একটি বিশেষ মহলের তদবিরে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ আছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আইজিপি হন আলী হোসেন ফকির। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও আবার পরিবর্তন আনা হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য আগের সরকারের আমলেও ভালো পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের ভেতর দলবাজির বিষয়টি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি সব সরকারের আমলেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে এক পুলিশের ভেতরই একাধিক গ্রুপ ছিল। ওই সব গ্রুপের নেতারা কারও নির্দেশই মানতেন না। বর্তমানে যারা দলবাজি করছেন, তারাও একসময় চরম অবহেলিত ছিলেন। তাদের দিনের পর দিন প্রমোশন ও পোস্টিং দেওয়া হয়নি।
হয়নি কোনো পরিবর্তন : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের আমলে যেমন ক্ষমতাধর ছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তাদের প্রভাবের কমতি ছিল না। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদেরই লেজুড়বৃত্তি করেছেন তারা। বিএনপি সরকারের আমলেও একই অবস্থা। আওয়ামী লীগের আমলে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পদোন্নতির পাশাপাশি ‘ভালো স্থানে’ চাকরি করেও নতুন সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পদোন্নতি পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, অনেকে ভালো স্থানে থেকে সরকারবিরোধীদের কাছে তথ্যফাঁস করে দিচ্ছেন। শুধু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ না, অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছেও তারা তথ্য দিচ্ছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এ কারণে সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে সরকারের হাইকমান্ড থেকে তাদের বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
যাদের বিষয়ে সংগ্রহ হচ্ছে তথ্য : পুলিশ সূত্র জানায়, সুবিধাভোগীদের মধ্যে চারজন অতিরিক্ত আইজিপি, আটজন ডিআইজি, ১৭ অতিরিক্ত ডিআইজি, শতাধিক পুলিশ সুপার, ১৫০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ২০০ ইন্সপেক্টর, হাজারখানেক সাব-ইন্সপেক্টরসহ অন্তত দুই হাজার কর্মকর্তার বিষয়ে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের একটি তালিকা করে আরও গভীর তদন্তও শুরু করেছে একাধিক সংস্থা। নতুন সরকার আসার পরপরই ভোল পাল্টে তারা নিজেদের বিএনপিপন্থি পরিচয় দিচ্ছেন। ‘বঞ্চিত আখ্যা’ দিয়ে তাদের সুবিধা নেওয়ার তথ্য গোপন তদন্তে উঠে এসেছে।
অনেকেই এখন আ.লীগবিরোধী : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা ভালো সুবিধা পেয়ে আসছেন। অনেকেই ভোল পাল্টে এখন আওয়ামী লীগবিরোধী হয়ে গেছেন। এতে কেউ কেউ সফলও হয়েছেন। এমনকি অর্থ খরচ করে ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়েছেন কেউ কেউ। যেসব কর্মকর্তা পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তারা কিন্তু আওয়ামী লীগের ১৬ বছর সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। অথচ এখন তারা বিশাল আওয়ামী লীগবিরোধী হয়ে গেছেন।
‘প্রভাবশালীদের’ ছায়া পান অনেকে : পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরে বিভিন্ন ইউনিটে ১০ বছর ধরে কর্মরত আছেন এমন কর্মকর্তাও এখনো একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রভাবশালীদের কাছাকাছি থাকায় বদলিও ঠেকিয়েছেন। সরকার বদলের পর এরাই এখন বঞ্চিত সেজে প্রভাব বিস্তার করছেন। আবার অনেকে বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ‘আখের গোছানোর’ চেষ্টা করছেন, যা পুরো পুলিশলাইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অথচ সরকারি চাকরিবিধি ও পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী অন্তত দুই বছর বদলির পর নিয়ম থাকলেও অনেক কর্মকর্তা ঘুরেফিরে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতেই থাকছেন। একেকজন একেক ‘বলয়ের’ দোহাই দিয়ে কাজ হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আসলে পুলিশ কখনো রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেকে তথ্য গায়েব বা ফাঁস করছেন। তাদের খতিয়ানগুলো মেলানো হচ্ছে। তদন্তে কেউ কেউ ফেঁসে যাওয়ার শংকাও আছে।