নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাতিলসহ ১২ দফা হেফাজতের

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০৭:১২ এএম

নারী সংস্কার কমিশন বাতিল, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা, শাপলা চত্বর ও জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ১২ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মহাসমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে আওয়ামী আমলে আলেমদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

এদিকে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিন মাসের মধ্যে বিভাগীয় সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আগামী ২৩ মে বাদ জুমা চার দফা আদায়ে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ্ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে মহাসমাবেশ শুরু হয় সকাল ৯টায়। শেষ হয় দুপুর দেড়টায়। পূর্বঘোষিত এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দীতে হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অংশ নেন। রাজধানীর বাইরে থেকেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বিভিন্ন বাহনে চড়ে সমাবেশে আসেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় সমাবেশস্থল।

হেফাজতে ইসলামের ১২ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও কোরআনবিরোধী প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিলপূর্বক আলেম-ওলামাদের পরামর্শক্রমে ধর্মপ্রাণ বৃহত্তর নারী সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে; সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে হবে। এলজিবিটি ও ট্রান্সজেন্ডারবাদের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমাজবিধ্বংসী ধর্মবিরুদ্ধ সমকামীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে; শাপলা চত্বর ও জুলাই গণহত্যার বিচারে গতি আনতে ট্রাইব্যুনালে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগেই শেখ হাসিনা ও তার চিহ্নিত দোসরদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে; গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

হেফাজতের আরও দাবির মধ্যে রয়েছে, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও তৎপরতা নিষিদ্ধ করতে হবে; আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর নামে কটূক্তি বন্ধে কঠোর আইন করতে হবে; চট্টগ্রামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে শহীদ অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম হত্যার উসকানিদাতা চিন্ময় দাসের জামিন প্রত্যাহারপূর্বক তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে; ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সারা দেশে প্রতিবাদী আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও ইসলামমনা তরুণদের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যে ও বানোয়াট সব মামলা অতিসত্ত্বর প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করতে হবে; দেশের সর্বস্তরের জনতাকে ইসরায়েলি ও ভারতীয় পণ্য বয়কট করতে হবে; শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সর্বপর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে; ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থে রাখাইনকে মানবিক করিডর প্রদানের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে; চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশি মিশনারি অপতৎপরতা ও দৌরাত্ম্য বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

মহাসমাবেশ থেকে নতুন দুটি কর্মসূচি ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এর মধ্যে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিন মাসের মধ্যে বিভাগীয় সম্মেলন করা এবং আগামী ২৩ মে বাদ জুমা চার দফা আদায়ে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করবে হেফাজতে ইসলাম। দাবিগুলো হলো- ১. নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের  কোরআন-সুন্নাহবিরোধী প্রতিবেদনসহ কমিশন বাতিল ২. সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল ৩. ফ্যাসিবাদের আমলে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যাসহ সব হত্যার বিচার এবং ৪. ফিলিস্তিন ও ভারতে মুসলিম গণহত্যা ও নিপীড়ন বন্ধে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

হেফাজতে ইসলামের নেতারা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূসের উদ্দেশে বলেন, শেখ হাসিনার মতো ভুল করবেন না। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো নীতি বাস্তবায়ন করার সাহস করবেন না। অবিলম্বে প্রতিবেদনসহ নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিল ঘোষণা করুন। শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করুন। আপনারা পিলখানা হত্যাকা-ের বিচারের জন্য কমিশন করেছেন, জুলাই আন্দোলনের গণহত্যার জন্য কমিশন করেছেন, ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছেন, কিন্তু মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত গণহত্যার বিচারের জন্য কেন তদন্ত কমিশন গঠন করলেন না? বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হলেও  হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। এসব মামলা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

সমাবেশে তাহরিকে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের আমির ড. মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী পীর জৈনপুরী বলেন, জঙ্গি তকমা দিয়ে আমার দেশের আলেম-ওলামাদের কারাগারে রাখা হয়েছে। বাবর সাহেব যদি মুক্তি পান তাহলে জঙ্গির মামলায় আলেম-ওলামারা কেন মুক্তি পাবে না। যদি তারা মুক্তি না পায়, তাহলে শুধু সংস্কার কেন নির্বাচন পর্যন্ত হতে দেওয়া হবে না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি ভুলে যাবেন না, আমরা আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি সন্ত্রাসী সংগঠন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেই সংস্কার করতে হবে। আওয়ামী লীগ মারা গেছে বাংলাদেশে, জানাজা হয়েছে দিল্লিতে।  যে আওয়ামী লীগ আমাদের দাড়ি-টুপিওয়ালা ভাইদের বায়তুল মোকাররমের সামনে  থেকে রাস্তায় নামিয়ে এনে হত্যা করেছিল, সেই আওয়ামী লীগের আর পুনর্বাসন হবে না।’

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মুফতি খলিল আহমদ কোরেশী কাসেমী বলেন, ‘যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে সেগুলো সরকারকে মানতে হবে। না হলে দেশের সব মানুষকে নিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা দাঁড়িয়ে যাবে। হেফাজত ছিল, আছে এবং থাকবে। আমরা আগের চেয়ে বেশি মজবুত হয়েছি। এ দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাস হবে আমরা তা মানব না।’

হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি জসীম উদ্দিন বলেন, ‘৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশে বহুত্ববাদ বাদ দিতে হবে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিল করতে হবে। ইসলাম ধর্মে নারীদের সবচেয়ে বেশি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত কোনো ধর্ম এ ধরনের মর্যাদা দিতে পারবে না। আল্লাহদ্রোহী ও আলেমদের হত্যাকারীদের বিচার করা হবে এই সরকারের প্রথম সংস্কার।

নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে কুসংস্কার করছে। তারা ফিরে না আসলে  হেফাজতে ইসলাম কঠিনতম কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। তাদের মুসলমান নামে বসবাস করতে দেওয়া হবে না।’

 হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেন, ‘নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলতি বছরের মধ্যে বিভাগের সম্মেলন করা হবে এবং ২৩ মে বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে আরও তীব্র করা হবে। এসব দাবি আদায়ে আমরা আন্দোলন করব, সংগ্রাম করব, প্রয়োজনে জেহাদ করব।’

হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ্ বাবুনগরী বলেন, ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন মেনে নেওয়া হবে না। নারী সংস্কার কমিশন ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে। হেফাজতে ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। আমরা সরকারের নিকট দাবি জানাচ্ছি, দেশের যৌতুকপ্রথা বন্ধে কঠোর আইন করুন। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’

সমাবেশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলছি, আগামী দুই মাসের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, সব নেতাকর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। বিগত সরকার জঙ্গিবাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে অনেক আলেমকে কারাগারে নিয়েছে। তাদের মুক্তি দিতে হবে।’ এ সময় তিনি শাপলা চত্বরে পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যে বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আহ্বান জানান।

বেগ পেতে হয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে : রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসমাবেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সমাবেশকে কেন্দ্র অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া এ সমাবেশ ঘিরে কোনো বেগ পেতে হয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি হেফাজতের স্বেচ্ছাসেবকরা সমাবেশস্থলের আশপাশে বিভিন্ন সিগন্যাল পয়েন্টে ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখা থেকে শুরু করে সামগ্রিক শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে কাজ করেন। এতে করে সড়কে যানজট ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি সাধারণ মানুষকে। শনিবার সমাবেশস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর আশপাশের এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত