যেভাবে কোকেনে আসক্ত হয়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ১২:২০ পিএম

ওয়াসিম আকরামকে বলা হয় ‘সুলতান অব সুইং’। পাকিস্তানের সাবেক এই গতি তারকা মাঠে প্রতিপক্ষের কাছে ছিলেন ত্রাস, অন্যদিকে তার ব্যক্তিজীবনেও বয়ে গেছে কত ঝড়। স্ত্রীর মৃত্যু, মাদকাসক্তি, হতাশা ওয়াসিমের মতো সুপারস্টারকেও কুরে কুরে খেয়েছে। এসব গল্পই তিনি শুনিয়েছেন আত্মজীবনী ‘সুলতান: এ মেমোয়র’–তে। সেখানে অকপটে জানিয়েছেন কোকেনে আসক্তি এবং সেটা থেকে মুক্তির ঘটনাও।

ওয়াসিম লিখেছেন, ‘শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের এক পার্টিতে, কেউ সামান্য একটু দিয়েছিল, সেটাই প্রথম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার আসক্তি বাড়তে লাগল। একটা পর্যায়ে এমন হল যে মনে হতো, স্বাভাবিক চলাফেরা করতেও আমাকে এটা নিতেই হবে। কোকেন আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। মিথ্যুক করে তুলেছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় খ্যাতির সংস্কৃতি এক ধরনের নেশা তৈরি করে। এটি আপনাকে প্রলোভন দেখাবে আর ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে।’

তিনি লিখেছেন, ‘এক রাতে দশটা পার্টিতেও যাওয়া যায়, কেউ কেউ সেটাই করে। এই জীবনযাত্রা আমাকেও ক্লান্ত করে তুলেছিল। আমার সহজ অভ্যাসগুলো ক্রমে বদভ্যাসে পরিণত হলো। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, আমি কোকেনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। আমি জানি হুমা (ওয়াসিমের প্রয়াত স্ত্রী) এই সময় ম্যানচেস্টার এবং লাহোরে প্রায়শই একা থাকত। সে করাচিতে তার বাবা-মা এবং ভাইবোনদের কাছে যেতে চাইত। কিন্তু করাচিতে আমার একা যেতেই ভালো লাগত। অজুহাত দিতাম কাজের, কিন্তু আসল কাজ ছিল পার্টি করা।’

‘এখন এটি স্বীকার করতে যতটা খারাপ লাগছে, তখন স্বীকার করা আরও কঠিন ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, হুমা এক পর্যায়ে আমাকে ধরে ফেলেছিল। আমার ওয়ালেটে কোকেনের একটি প্যাকেট খুঁজে পায় সে। স্ত্রী এবং মা হিসেবে যেমন প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা, সেটাই দেখিয়েছে। সে বলল ‘আমি জানি তুমি মাদক নিচ্ছ, তোমার সাহায্য দরকার। আমিও রাজি হলাম। কারণ ওটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। বাড়তে বাড়তে এক গ্রাম, দুই গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল। আমি ঘুমাতে পারতাম না। খেতে পারতাম না। ডায়াবেটিস ছিল। তাই আমি একটা পুনর্বাসন প্রোগ্রামে ভর্তি হতে রাজি হলাম।’

অবশেষে রিহ্যাবে ভর্তি হন ওয়াসিম। সেখানকার জীবনও তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে, ‘আমার তখন সেরে ওঠা দরকার। সিনেমায় রিহ্যাব বোঝাতে একটি যত্নশীল, লালনপালনের পরিবেশ দেখানো হয়। কিন্তু লাহোরের ওই রিহ্যাবটি ছিল খুব বাজে। পাঁচটি কক্ষ, একটি মিটিং রুম এবং একটি রান্নাঘর সহ একটি খালি ভবন। ডাক্তারটা ছিল বাটপার ধরনের। রোগীর চিকিৎসার বদলে সে মূলত পরিবারকে উল্টাপাল্টা বোঝাত। ব্যবহারকারীদের মাদক থেকে আলাদা করার পরিবর্তে স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ছিল তার মূল চিন্তা। প্রতি সপ্তাহের জন্য ২ লাখ রুপির বেশি চার্জ করত।’

‘আমাকে প্রথমে জানানো হয়েছিল এক মাস থাকতে হবে। দুদিন পরই জানানো হল, অন্তত তিন মাস থাকতে হবে। চিকিৎসা বলতে ছিল শরীর নিস্তেজ করে রাখা, সকালে ও সন্ধ্যায় মুঠো মুঠো ট্যাবলেট খাওয়া, সাথে বক্তৃতা আর প্রার্থনা। আমার খুব আলসেমি ভর করত। ওজন বেড়ে গিয়েছিল। দিনে এক ঘণ্টা আমি আমাদের ছোট ব্যায়ামাগারের চারপাশে জম্বির মতো ঘুরে বেড়াতাম। সেখান থেকে আমার বাবার অফিস দেখা যায়, যদিও তিনি জানতেন না আমি কোথায় আছি। এ সবের বাইরে শুধু মন খারাপ করে বসে থাকা ছাড়া আমার করার কিছুই ছিল না।’

‘এক মাস আমি হুমা, তাহমুর ও আকবরকে দেখিনি। একবার তারা দেখা করতে এলে আমি রেগে গিয়ে হুমাকে বললাম, “আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে। আমাকে কাজ করতে হবে। আমাকে আমার বসকে ফোন করতে হবে। নইলে তারা আমাকে বরখাস্ত করবে!’ ডাক্তার বিজয়ীর মতো হাসলেন। বেশ আত্মতৃপ্তির সঙ্গে হুমাকে বললেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম, সে এরকমই করবে!’ আরও সাত সপ্তাহ পর হুমা যখন বুঝল ডাক্তার একজন বাটপার, তখন বের করে নিয়ে আসল। বের হওয়ার পর আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করি, স্থির হওয়ার চেষ্টা করি। এমন সময়ে শাহরুখ খান আমাকে কলকাতা নাইট রাইডার্সে বোলিং কোচের একটি আকর্ষণীয় চাকরি প্রস্তাব করে। কয়েকমাস পর হুমা আমাকে দেখে বলল- “ওয়াসিমকে আগের চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে, যদিও আমি নিশ্চিত নই”।’

এই ঘটনার পরও কোকেন সেবন পুরোপুরি ছাড়েননি ওয়াসিম আকরাম। হুমা অনেক চেষ্টা করেছেন তাকে ভালো করে তুলতে। একপর্যায়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংক্রামক এন্ডোকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। হুমার মৃত্যুর কয়েক বছর পর ২০১৩ সালে ওয়াসিম আকরাম দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন অস্ট্রেলিয়ার শানিয়ারা থম্পসনকে। তাদের একটা কন্যাসন্তান আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত