জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় তামাকপণ্যে কর ও মূল্য বৃদ্ধির জোর দাবি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০১:৫২ পিএম

তামাকের ভয়াবহতা রোধ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় তামাকজাত পণ্যের উপর মূল্য ও কর বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। 

আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের ১৫০ জন চিকিৎসকের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে অংশ নেওয়া বিশিষ্ট চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন—স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য ও স্কয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি), অধ্যাপক ডা. এম এ হাই—পরিচালক, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি হাসপাতাল ও ওয়েলফেয়ার হোম; অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক—সভাপতি, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি; অধ্যাপক ডা. এ এম এম শরিফুল আলম—বিভাগীয় প্রধান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, আহ্ছানিয়া মিশন হাসপাতাল এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. মো. কুদরত-ই-ইলাহী—সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, উত্তরা।

তাঁরা বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর যে আটটি প্রধান কারণ রয়েছে, তার মধ্যে ছয়টিতেই তামাক কোনো না কোনোভাবে জড়িত। ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, গ্যাংগ্রিন, খাদ্যনালীর ক্যান্সারসহ বহু প্রাণঘাতী জটিলতার উৎস তামাক। এসব তথ্য এখন আর কারও অজানা নয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ট্রেন্ড অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ফ্যাক্টশিটে গ্যাটস ও স্টেপস (২০০৯–২০২২) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে ২৫ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করেন। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, ধূমপান না করেও দেশের ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক বিভিন্ন কর্মস্থল, গণপরিবহন এবং জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। অথচ পরোক্ষ ধূমপানও স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে সরাসরি ধূমপানের সমান ক্ষতিকর। গবেষণা বলছে, তামাক ব্যবহারকারীদের হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ বেড়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর মৃত্যু ঘটে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের।

চিকিৎসকদের মতে, এই বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে তামাকজাত পণ্যের উপর কার্যকরভাবে করারোপ করে এর মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। এতে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য রক্ষা পাবে, তেমনি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথও প্রশস্ত হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের মাথাপিছু আয় ৪৬৮ ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে। তবে এ সময়ে অধিকাংশ সিগারেট ব্র্যান্ডের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে বা খুব সামান্য বেড়েছে, ফলে প্রকৃত অর্থে সিগারেটের মূল্য কমে যাওয়ায় তা আরও সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিগারেটের সব স্তরে সম্পূরক শুল্ক ৬৭ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এতেও নিম্ন ও মধ্যম মানের সিগারেটের দাম সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়ে গেছে—যেমন প্রতি শলাকা ৬ টাকা ও ৮ টাকা। অথচ এই দুটি স্তরের সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট ব্যবহারকারীর ৭৫ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের প্রস্তাব, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে এর সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য প্রতি শলাকা ৯ টাকা নির্ধারণ করা হোক। এতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ও তরুণদের মধ্যে সিগারেটের ব্যবহার কমবে এবং রাজস্ব আয়ও বাড়বে। পাশাপাশি প্রিমিয়াম সিগারেটের ১০ শলাকার দাম ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাবও তাঁরা দিয়েছেন।

বিড়ির ক্ষেত্রেও প্রতিটি বিড়ির দাম কমপক্ষে ১ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার দাম ৫৫ টাকা এবং গুলের দাম ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যদি তামাক পণ্যের কর কাঠামো সংস্কার করে, তাহলে সিগারেটের ব্যবহার ১৫.১ শতাংশ থেকে কমে ১৩.০৩ শতাংশে নেমে আসবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবেন এবং ১৭ লাখ তরুণ ধূমপানে নিরুৎসাহিত হবেন। দীর্ঘমেয়াদে ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও ৮ লাখ ৬৯ হাজার তরুণের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সরকার আয় করতে পারবে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে করারোপ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও কার্যকর কৌশল। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিদ্যমান কর কাঠামোর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত