ফেনীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংকট দেখা দিয়েছে। নানা উদ্যোগ নিলেও বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির হার বাড়ছে না। অভিভাবকদের মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনে সন্তানকে ভর্তির আগ্রহকে দায়ী করছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তবে অভিভাবকেরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়াশোনার মান ভালো হওয়ায় তারা সন্তানদের এসব জায়গায় ভর্তি করাচ্ছেন।
ফেনী জেলার ৬টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ফেনী জেলার ৫৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ৫০ এর নিচে ছাত্রছাত্রী ১২টি ও ১৬৮ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ১০০ এর নিচে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৩ থেকে ১২ জন শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন করছেন অভিভাবকরা। সরেজমিন এসব বিদ্যালয়ের চিত্র আরও খারাপ।
ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৬ জন শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। গত বছর (২০২৪) ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭০ জন, যা গত বছরের থেকে ১১ হাজার ৬২৪ জন কম।
এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের কোনো মিল নেই। ফেনী জেলার ৬টি উপজেলায় চলতি বছরে ভর্তিকৃত শিশুর সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৯৫জন। যা জেলা তথ্য থেকে ৯৯ হাজার ১৫১ জন কম।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ৯ এপ্রিলের আপডেটকৃত তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলায় ৭৪ হাজার ৪৮১ জন, সোনাগাজী উপজেলায় ২৯ হাজার ৯২৮ জন, দাগনভুঁঞা উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৮৪ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ১৫ হাজার ৩৩৩ জন, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ১১ হাজার ০৫০ জন, পরশুরাম উপজেলায় ১৩ হাজার ৭৭০ জন দেখানো হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলায় ২৩ হাজার ৩৮৪ জন, সোনাগাজী উপজেলায় ১৩ হাজার ৬৬৯ জন, দাগনভুঁঞা উপজেলায় ১৬ হাজার ৮২২ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ৬ হাজার ৭৮৫ জন, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ৪ হাজার ৮১৫ জন, পরশুরাম উপজেলায় ৭ হাজার ৩২০ জন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর (২০২৫ সালে) বিদ্যালয়ে গমন উপযোগী পাঁচ বছরের বেশি ১০ বছর পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১ লক্ষ ৭৪ হাজার ৭৬২ জন। যা ভর্তিকৃত শিশুর থেকে ২ হাজার ৮১৬ জন বেশি। যা মোট ভর্তির ৯৭.৪৮%। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র উল্টো। সরেজমিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেকে দ্বিগুণ ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছে মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্ডেন।
জানা যায়, ফুলগাজী উপজেলার নিলখী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২জন, পেছিবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৫ জন, আমেনা বেগম উত্তর আনন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৩ জন, দেবীপুর ফেরদৌস আক্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৩ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার সাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৮ জন, কসবা ধর্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৯ জন, সওদাগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৭ জন, উত্তর শিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৯ জন। সোনাগাজী উপজেলার উত্তর-পশ্চিম চর দরবেশ হোসেন মাস্টার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ জন, দক্ষিণ চরসাহাভিকারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ জন, পূর্ববড়ধলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৩ জন , হাজী শেখ মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৭ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে।
সরেজমিন সোনাগাজীর পূর্ব বড়ধলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিশু শ্রেণিতে ৫ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১ জন, ২য় শ্রেণিতে ৫ জন, ৩য় শ্রেণিতে ৩ জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ১০ জন ও ৫ম শ্রেণিতে ৩ জনসহ মোট ২৭ জন উপস্থিত রয়েছে। বিদ্যালয়ের মোট ছাত্রছাত্রী ৩৩ জন। ফুলগাজীর দেবীপুর ফেরদৌস আক্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গিয়ে দেখা যায়, ২২ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ২০ জন ছাত্রছাত্রী উপস্থিত রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিতে কেউ আসেনি।
ফেনী শহরের রামপুরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে আমি শাহীন একাডেমীতে দিয়েছি, সেখানে পড়ালেখা ভালো হয়। পাশেই রামপুর সরকারী বালিকা বিদ্যালয় থাকলেও কেন দেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকরা মনোযোগ দিয়ে পড়ান না।
ফুলগাজীর দেবীপুর ফেরদৌস আক্তার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জীবন চন্দ্র দাস বলেন, বিদ্যালয়ে মাত্র তিন জন শিক্ষক, দূরত্বের কারণে শিক্ষকরা আসতে চান না। বিদ্যালয়ে মাত্র ২২ জন ছাত্রছাত্রীর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিভাবকরা মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্ডেনমুখী।
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব মহি উদ্দিন খন্দকার বলেন, অনেক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি কিন্টার গার্ডেন ও মাদ্রাসা থাকা, ধর্মীয় বিশ্বাসের সহিত সাংঘর্ষিক পাঠ্যবই ও ধর্মীয় শিক্ষক না থাকা, যত্রতত্র গড়ে উঠা কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসার উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হওয়ায় অনেক সময় ক্লাসরুমে পাঠদানে অনীহা তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।
সোনাগাজী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম তাহেরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় চরাঞ্চলে শিশুরা পিতার সাথে পরিবারের কাজ করে। কিছু পরিবার ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যায়। তবে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ, মা সমাবেশসহ শিক্ষার্থী বাড়ানোর জন্য নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন ফেনীর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, সচ্ছল ও বিত্তবান পরিবারের সন্তান যাচ্ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়ে। ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে হিমশিম খেলেও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বাড়ির পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ ও শিক্ষার্থী সংকট সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘ বন্ধ থাকার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। স্থানীয় ভাবে মক্তব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকছে অভিভাবকরা।
জেলা অফিসের তথ্যের সাথে উপজেলা তথ্যের মিল না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখান থেকে যে তথ্য দেয়া হয়েছে তা বইয়ের চাহিদার জন্য তৈরি তথ্য। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে এখনো ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীদের তথ্য জেলা অফিস সংগ্রহ করেনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মিজ ফাতিমা সুলতানা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ চিত্র হতাশাজনক। আমরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে, বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৩০ জন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপ অনুসারে, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের গড় সংখ্যা ৬, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২৯। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষক সংখ্যা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আরও অবনতি হবে। মূলত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে একীভূতকরণ পরিহার করে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
শিক্ষাকে কার্যকর ও মানসম্পন্ন করতে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, তাই ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে তৎকালীন সরকার। ফলে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হন। ২০১৩ সালে পুনরায় ২৬ হাজার বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। আগের তুলনায় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তীকরণে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে এবং এখনো চলমান। যেমন উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, মিড ডে মিল, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো তৈরি এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার ইত্যাদি। এ সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে নেই অভিভাবকদের আস্থা। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর কম হলে পাশের বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করা হবে।
