মাগুরায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যায় হিটু শেখের মৃত্যুদন্ড

আপডেট : ১৮ মে ২০২৫, ০৭:১২ এএম

সভ্যতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল মাগুরায় আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। শিশুটির সুস্থতা কামনায় দেশ জুড়ে প্রার্থনা হয়েছিল, দোষীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের জন্য রাস্তায় নেমেছিল মানুষ। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সংশোধন হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার শুরুর ২১ দিনের মাথায় গতকাল শনিবার মামলার রায় ঘোষণা হলো। সকালে মাগুরার আদালত রায়ে মামলার প্রধান আসামি শিশুর বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছে। অপরাধের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় অন্য তিনজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। 

মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় দেন। এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় কড়া নিরাপত্তায় আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। গত ১৩ মে মামলার শুনানির সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায়ের জন্য গতকাল দিন ধার্য করেছিল আদালত।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় হিটু শেখকে সর্বোচ্চ এ সাজা দেয় আদালত। অন্যদিকে শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখকে দন্ডবিধির ৫০৬ ধারায় (ভয়ভীতি দেখানো) এবং বোনের শাশুড়ি জাহিদা বেগমকে দন্ডবিধির ২০১ ধারায় (আলামত গোপন) অভিযোগ আনা হলেও তা প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেয় আদালত। যদিও সব আসামির শাস্তি না হওয়ায় রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিশুর মা। এ ছাড়া খালাসপ্রাপ্তদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে ধর্ষণ মামলার এটি দ্বিতীয় দ্রুততম রায়। ২০২০ সালে ৩ অক্টোবর বাগেরহাটের মোংলায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আসামি করা হয় ৫৩ বছর বয়সী আবদুল মান্নান সরকারকে। এরপর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর মাত্র সাত কার্যদিবস শুনানি নিয়ে ওই মাসের ১৯ অক্টোবর রায় দেয় বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে আবদুল মান্নানকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় আদালত। মাগুরার শিশুটি ধর্ষণের ঘটনার ২ মাস ১২ দিন, মৃত্যুর ৬৬ দিন, অভিযোগপত্র দাখিলের ৩৭ দিন, অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচার শুরুর আদেশের ২৫ দিনে, সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর ২১ দিনে এবং ১৩ কার্যদিবস শুনানি নিয়ে আলোচিত এ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মামলায় রায় এলো।

দেশে ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ, সাক্ষ্যগ্রহণ, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন, যুক্তিতর্কের শুনানি আইনের এই প্রতিটি স্তরে বছরের পর বছর সময় পেরিয়ে যায়। সাক্ষীর গরহাজিরায় ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়। এজন্য বেশিরভাগই ধর্ষণের মামলার আসামি খালাস পায় বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে গতকাল মাগুরায় এ ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়টি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি বিরল নজির এবং প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করেন ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞরা।

তিন আসামির খালাসে সন্তুষ্ট নন শিশুর মা : মামলায় প্রধান আসামির মৃত্যুদন্ড হলেও বাকি তিন আসামির খালাসে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিশুর মা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘খুশি হব কী করে, ওরা তিনজনই জানত, ওরা আমার বড় মেয়েকে হুমকি দিয়ে প্রচুর মারধর করেছে। ওরা আজকে আমার মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করেছে, কাল ছাড়া পেয়ে অন্য কোথাও করবে। আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট হইনি।’

শিশুটির মা আরও বলেন, ‘তারা কীভাবে খালাস পেয়ে গেল? ওরাও তো দোষী। আমি চাই ওদেরও শাস্তি হোক। আমি হাইকোর্টে যাব, যাতে ওই তিনজনেরও শাস্তি হয়।’

পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে খালাসপ্রাপ্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত : রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলায় শুনানি করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল প্রসিকিউটর অ্যাডভাইজর অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী ও কৌঁসুলি মনিরুল ইসলাম মুকুল। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী বলেন, ‘শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার কারণে বাংলাদেশে ও বহির্বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। মানুষ ন্যায়বিচার চেয়েছে। সবার সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন, যা একটি বিরল ইতিহাস হয়ে থাকবে। এ মামলার রায়ের মাধ্যমে এবং দ্রুততম সময়ে বিচারের মাধ্যমে একটি বার্তা সবার জন্য প্রণিধানযোগ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থায় বিচারিক আদালত তার জুডিশিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে অ্যাভিডেন্স অন রেকর্ডের ওপর এ রায় দিয়েছে। আসামি হিটু শেখের বিরুদ্ধে আদালত যে রায় দিয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু খালাসের বিষয়ে রায়ের কপি সংগ্রহ করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে আপিল করব।’

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘মূল আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। অন্য তিনজনকে কেন খালাস দেওয়া হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিলের বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামি পক্ষের আইনজীবী (লিগ্যাল এইড) সোহেল আহম্মেদ বলেন, ‘তিন আসামিকে খালাস দেওয়ায় আমরা খুশি। আর মূল আসামির মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, তা তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে বলে।’

যেভাবে দেশকে নাড়িয়ে দেয় ঘটনাটি : ১ মার্চ মাগুরায় বোনের বাড়ি বেড়াতে যায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওই শিশুটি। গত ৬ মার্চ ভোরে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়। প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতাল, এরপর অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর ৮ মার্চ তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের ক্ষত ছিল। গণমাধ্যমে এই শিশুর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিশুটিকে সুস্থ করে তুলতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা হয়। কিন্তু সংকটাপন্নে থাকা এই শিশুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে থাকা শিশুটির জন্য কয়েক দিন পথে নেমেছিল ছাত্র, শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লাখো মানুষ। ধর্ষকদের দ্রুত সর্বোচ্চ বিচার দাবিতে মুখর হয় সারা দেশ। এরই মধ্যে ১৩ মার্চ দুপুর ১টার পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মাগুরায় নির্যাতিত শিশুটি মারা গেছে। এ ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। ওইদিন সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে শিশুটির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাগুরায় তার নিজ গ্রামে। দুই দফা জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

দেশ জুড়ে তীব্র আন্দোলন এবং বিক্ষোভের মধ্যে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে। এতে ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং অভিযোগ গঠনের পর বিচার শেষ করতে ৯০ দিন সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচারক মামলার বিচারকাজ চালাতে পারবেন এমন বিধান রাখা হয় সংশোধিত আইনে। এরই ধারাবাহিকতায় শিশুটির মৃত্যুর দুই মাস চার দিনের মাথায় নৃশংস এ ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডে অধস্তন আদালতের রায় ঘোষণা হলো।

যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ : শিশুর মা ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। পরে এ মামলাটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলায় শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, শাশুড়ি জাহিদা বেগম, বড় বোনের স্বামী সজীব শেখ ও ভাশুর রাতুল শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডিএনএ পরীক্ষায় শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনায় হিটু শেখের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ঘটনার পর ১৫ মার্চ আদালতে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি হিটু শেখ। ৩৭ দিন তদন্ত শেষে গত ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক মো. আলাউদ্দিন। ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরুর আদেশ হয়। ২৭ এপ্রিল শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।

যা বলছেন মাগুরার স্থানীয়রা : জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহেদ হাসান টগর বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর যেভাবে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তার জন্য আসামির সাজা দৃষ্টান্তমূলক অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিচারাঙ্গনে এই রায় দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

আইনজীবী চাদ সুলতানা বলেন, ‘হিটু শেখের ফাঁসির রায়ে আমরা মাগুরাবাসী সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি। এ রকম দ্রুত বিচার পেলে এ ধরনের ঘৃণ্য কাজের কথা অপরাধীরা তাদের চিন্তায় আনতে পারবে না। তবে, তিন আসামির খালাসে আমরা শঙ্কিত।’ শহরের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে মাগুরাবাসী কলঙ্কমুক্ত হলো। আশা করি, এ রায় দ্রুত কার্যকর হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত