কর্মসূচি স্থগিত সশস্ত্র বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতদের

আপডেট : ১৯ মে ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দিনভর বিক্ষোভ শেষে কর্মসূচি স্থগিত করেছেন বিভিন্ন সময় সশস্ত্র বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া একদল ব্যক্তি। গতকাল রবিবার বিকেলে দাবিদাওয়া বিবেচনার আশ্বাস এবং কয়েক ঘণ্টা আলোচনার পর সন্ধ্যায় তারা কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর আগে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে দুপুরে কর্মসূচি শুরু করলে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

তিনটি শর্তে বিক্ষোভ স্থগিত করা হয়েছে বলে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া আট সদস্য জানান। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বরখাস্ত হওয়া সৈনিক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের সৈনিক নাইমুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে সে কারাগারে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ও আমাদের আট প্রতিনিধি গিয়ে তিনিসহ গ্রেপ্তার সবাইকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।’

কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘১০ বছরের নিচে যেসব সৈনিকের চাকরির বয়স ছিল, তাদের পুনর্বহালের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন সেনা কর্মকর্তারা। যাদের চাকরির বয়স নেই, তাদের পেনশনের আওতাভুক্ত করা হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে নাইমুলসহ অন্যদের মুক্তি না দিলে ফের কর্মসূচি দেওয়া হবে। সেই পর্যন্ত সবাইকে ঢাকায় অবস্থান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।’

কর্মসূচির মধ্যেই সেনাবাহিনীর ভেটেরান ডিরেক্টর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনুর রহমানসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাদের কথা শোনেন। বিকেলে প্রথম দফার আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাদের দাবিদাওয়াগুলো শুনেছি। আমরা সব দাবিদাওয়া নোট করেছি। এগুলো নিয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আমিনুর রহমান বলেন, ‘তাদের বলেছি, সবাইকে আলাদা আলাদা করে আবেদন করতে। আবেদনের ঠিকানা আমরা দিয়ে গেছি। ইনডিভিজুয়াল কেসের মেরিট অনুযায়ী আমরা বসব, আলাপ-আলোচনা করে আপনাদের যত দ্রুত সম্ভব, যতখানি দেওয়া সম্ভব, আমরা অ্যাড্রেস করব। এটাও বলেছি যে, সেনাবাহিনীর যে আইনশৃঙ্খলা, এটা অবশ্যই মেইনটেইন করতে হবে। আমরা মানবিকভাবে যতটুকু সাহায্য করার করব।’

গত শনিবার তাদের একজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমিনুর রহমান বলেন, ‘ওটা একটা আইনগত বিষয়; মামলার বিষয় এবং তাকে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সহায়তা করা যায়, আমরা করব। আটশর মতো অ্যাপ্লিকেশন পড়েছে, যার মধ্যে একশর বেশি আমরা অ্যাড্রেস করেছি।’ আপনাদের কথায় তারা সন্তুষ্ট কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনে তো হলো সন্তুষ্ট।’ সবশেষে তিনি এ কর্মসূচি সমাপ্ত করার অনুরোধ জানান।

এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রেস ক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনুর রহমানের গাড়িবহরের সামনে চাকরিচ্যুতরা শুয়ে পড়েন। পরে প্রেস ক্লাবের ভেতর থেকে গাড়ি আর বের হতে পারেনি। পরে আমিনুর রহমান আবার গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে বোঝান। প্রেস ক্লাবের ভেতরে শতাধিক সেনাসদস্য উপস্থিত ছিলেন। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সমঝোতার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রেস ক্লাব থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেন। এরপর সেনা কর্মকর্তা সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

এদিকে এ অবস্থান কর্মসূচি কেন্দ্র করে ঢাকা সেনানিবাসের প্রবেশমুখ ও চারপাশে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারা। সকাল থেকে জাহাঙ্গীর গেট, বিএএফ শাহীন কলেজ, মহাখালী রেলগেট, কাকলী, বনানীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়, ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও।

সরেজমিন দেখা গেছে, জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় উভয় পাশে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দিনব্যাপী কড়া পাহারায় ছিল। এ ছাড়া বিএএফ শাহীন কলেজের সামনে মহাখালী রেলগেটে, কাকলী, বনানী ও কচুক্ষেতেও ছিলেন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তবে এসব এলাকায় কাউকে জড়ো হতে দেখা যায়নি।

সাবেক সেনাসদস্যদের বিক্ষোভ ও সেনাবাহিনীর অবস্থান : এ কর্মসূচির বিষয়ে রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলেছে, আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির বিষয়টি শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল প্রেস ক্লাবে গিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের বক্তব্য শোনে। প্রতিনিধিদল সেনাবাহিনীর প্রচলিত বিধিবিধান অনুসারে দাবিদাওয়া যাচাই ও সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। একইসঙ্গে অভিযোগগুলো কোনো তৃতীয় পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে না পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি উপস্থাপনের পরামর্শ দেয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর বলেছে, ‘এর আগে গত ১৪ মে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয় এ ধরনের মোট ৮০২টি আবেদন গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ১০৬টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বাকি আবেদনসমূহ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে যা সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও মানবিকতার সঙ্গে বিবেচনা করছে।

তবে দুঃখজনক যে, আজকের কিছু অনভিপ্রেত আচরণ এই সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পরপর দুবার সফল বৈঠক শেষে, প্রতিনিধিদল ফেরত যাওয়ার সময় কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল বরখাস্ত সেনাসদস্যের উসকানিতে উক্ত প্রতিনিধিদলের গাড়ির সম্মুখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং অশ্রাব্য ভাষায় স্লোগান দেওয়া হয়। সমগ্র দিন জুড়ে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সহমর্মিতার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালেও একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছুসংখ্যক বিশৃঙ্খল সাবেক সদস্যকে ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হয়।’

আইএসপিআর বলেছে, ‘যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কার্যকলাপ, জনস্বার্থবিরোধী আচরণ কিংবা বাহিনীর সুনাম ক্ষুন্ন করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড কখনোই কাম্য নয়। সব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং সংবেদনশীলতার সাথে বিষয়টি বিবেচনা করছে। সাংবিধানিক কাঠামো ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য সেনাবাহিনী পুনরায় সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত