ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি এখনই শেষ হচ্ছে না!

আপডেট : ১৯ মে ২০২৫, ০৯:২৩ এএম

চলমান উত্তেজনার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, সেটির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই বলে দুই দেশের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে এমন গুজবের অবসান ঘটেছে। খবর: ডন

সম্প্রতি পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার দেশটির সিনেটে জানান, ১৪ মে ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেল মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও) পর্যায়ে কথা হয়েছে এবং সেখানে ১৮ মে পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর গণমাধ্যমে খবর ছড়ায় যে, এই সমঝোতা ১৮ মে শেষ হয়ে যাবে। তবে রবিবার (১৯ মে) দুই দেশের কর্মকর্তারাই জানান, ওই দিন নতুন কোনো ডিজিএমও বৈঠক ছিল না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতায় যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, সেটি মেয়াদহীনভাবেই বহাল রয়েছে।

এক ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, “১২ মে ডিজিএমও পর্যায়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—এই বিরতিতে কোনো মেয়াদ নেই।” এর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ছে—এমন ধারণা নাকচ করে দেন তিনি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং এর কোনো নির্ধারিত মেয়াদ নেই। ডিজিএমও পর্যায়ের আলোচনার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই সমঝোতাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা।”

দুই দশকে সবচেয়ে বড় উত্তেজনার পর যুদ্ধবিরতি

১০ মে থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এক টানা সংঘাতের পর, যা গত দুই দশকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সময় সীমান্ত এলাকায় গোলাবর্ষণ, ড্রোন অনুপ্রবেশ এবং বিমান হামলার মতো ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে এবং সৌদি আরবের সহায়তায় যুদ্ধবিরতিটি বাস্তবায়িত হয়।

যুদ্ধবিরতির ঠিক পরদিন কিছু লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও এরপর থেকে দুই দেশের সামরিক কমান্ডাররা গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ১২ মে পাকিস্তানের মেজর জেনারেল কাশিফ আবদুল্লাহ এবং ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘোষের মধ্যে ফোনালাপে উত্তেজনা প্রশমনে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

সেই আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, সীমান্তে দুই দেশের সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে তাদের সামনের অবস্থান থেকে সরবে এবং সাধারণ সময়ের মতো সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত থাকবে পাকিস্তান রেঞ্জার্স ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শফকত আলী খান জানান, “১০ মে থেকে দুই দেশের ডিজিএমওরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং উত্তেজনা প্রশমনে একটি কাঠামোগত পদ্ধতি তৈরিতে সম্মত হয়েছেন।”

ভারত-নির্ভরতা নিয়ে দ্বিধায় ইসলামাবাদ

ইসলামাবাদ এই যুদ্ধবিরতিকে দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনার একটি সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখছে—বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু এবং পানির অধিকার নিয়ে। তবে ভারত সরকারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই যুদ্ধবিরতিকে “সাময়িক বিরতি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, “অপারেশন সিন্দুর এখনো শেষ হয়নি... পাকিস্তান এখনো পর্যবেক্ষণে রয়েছে।”

পাকিস্তানের আস্থা ও হুঁশিয়ারি

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী আরব নিউজকে বলেন, “যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।” তিনি জানান, “যদি কোনো লঙ্ঘন ঘটে, তাহলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া সবসময়ই থাকবে। তবে তা শুধুমাত্র সেইসব পোস্ট এবং অবস্থানের বিরুদ্ধে, যেখান থেকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন ঘটে। আমরা কখনো সাধারণ নাগরিক বা বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানিনা।”

তিনি আরও বলেন, কাশ্মীর ইস্যু এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের কারণ হিসেবে রয়ে গেছে এবং এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

পানি ইস্যুতে ভারতীয় হুমকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি ভারত পাকিস্তানের পানি আটকে দেওয়ার মতো কোনো একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হবে। গত মাসে ভারত একতরফাভাবে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে, যা একাধিক যুদ্ধের মধ্যেও টিকে ছিল। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে যে, ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে একটি হামলার জন্য তারা দায়ী।”

পানির চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত সিন্ধু চুক্তিটি বিশ্বে সবচেয়ে সফল পানিবণ্টন চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধের সময়ও এই চুক্তি টিকে ছিল। চুক্তি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, “কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের দমনমূলক নীতি কাজ করছে না। যতদিন না ভারত আলোচনায় বসে, ততদিন দ্বিপাক্ষিক সমাধান আসবে না এবং সংঘর্ষের সম্ভাবনা থেকেই যাবে। আমি আশা করি সেই সময় যেন না আসে, তবে যদি আসে, তাহলে তার প্রভাব দশকজুড়ে টিকতে পারে।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত