জ্বালানী সংকটে শিল্প উৎপাদন বিপর্যয়ে সরকারের নিকট ৩ দাবি

আপডেট : ২৫ মে ২০২৫, ০৭:২৯ পিএম

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, দেশের শিল্পকারখানা বিশেষ করে টেক্সটাইল মিল এবং পোশাক খাতে গ্যাস সরবরাহে খুবই সংকট তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা পরিস্থিতিতে সমস্যা আরও প্রকট ধারণ করায় শিল্প উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিকারকরা। 

রবিবার (২৫ মে)  রাজধানীর গুলশান ক্লাবে শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিসিআই, আসিসি বাংলাদেশ, এলএফএমইএবি, বিটিটিএলএমইএ, বিপিজিএমইএর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এসময় সমস্যা সমাধানে সরকারের নিকট তিন দফা দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। 

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘এক থেকে দেড় মাস ধরে চলা প্রকট গ্যাস সংকটে দেশের রপ্তানিনির্ভর ও স্থানীয় টেক্সটাইল মিল এবং পোশাক খাতসহ অনেক খাতের কারখানার উৎপাদন আংশিক অথবা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।’

বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকা শক্তি দেশের টেক্সটাইল খাত র্দীঘদিন যাবত বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্রমাগত অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের সংকট, ব্যাংক সুদের হার ১৮ শতাংশ র্পযন্ত বৃদ্ধি, মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদশের রপ্তানী পণ্যের উপর আরোপিত অতিরিক্তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক, রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনার অস্বাভাবকি হ্রাস এবং টাকার অবমূল্যায়নরে কারনে কারখানা মালিকরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। 

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে পোশাক কারখানাগুলো উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় চলমান কার্যাদেশ অনুযায়ী যথাসময়ে পণ্য সরবরাহের জন্য বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে বিমান পথে অতিরিক্ত খরচে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে পোশাক কারখানাগুলোকে বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।’ 

সমস্যা সমাধানে তিন দফা দাবি তুলে ধরে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘দেশের জুলাই- আগস্টের আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে গঠিত সরকারের কাছে আমরা সকল বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দেশের সার্থে অনতিবিলম্বে দেশীয় টেক্সটাইল খাতসহ সকল শিল্প খাতের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আমাদের দাবী তুলে ধরছি। অবিলম্বে জ্বালানী এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিল্প খাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শিল্পখাত ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোয় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করা এবং এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে একটি প্রতিযোগীশীল ও টেকসই মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা প্রণয়ন; এবং শিল্পখাতে বিরাজমান গ্যাসের সংকট মোকাবেলায় জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য মধ্য-দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ‘ 

লিখিত বক্তব্যে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, আপনারা জানেন গত ৪ থেকে ৬ মে বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিটিএলএমইএমের  পক্ষ থেকে দেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় পত্রিকায় গ্যাস সংকটের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে বিজ্ঞাপন প্রদান করা হলেও অদ্যাবধি এই সংকটের কোন সমাধান হয়নি । বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিটিএলএমইএমের অধীনের টেক্সটাইল এবং আ্যপারেল পোশাক কারখানাগুলোর দেশের রপ্তানিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ অবদান। গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে রপ্তানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান করা উচিৎ হলেও তা করা হচ্ছে না বরং রপ্তানি আয়ের মূল উৎসের প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাসের অভাবে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। অধিকাংশ টেক্সটাইল মিল এবং পোশাক কারখানায় গ্যাসের শূন্য চাপের প্রমাণ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের এই অবস্থা চলতে থাকলে বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিটিএলএমইএমের অধীনের টেক্সটাইল এবং পোশাক খাতের প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এই সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যহত হয়ে রপ্তানি কমে যাবে । ফলে ফরেন রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে । সামষ্টিক অর্থনীতি মেরামতের সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে । নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। এতে আর্থিক সংকট ঘনিভূত হবে, ব্যাংক ঋণ এবং শ্রমিকদের বেতনাদি পরিশোধে আশঙ্কা তৈরী হবে মর্মে উৎপাদক এবং রপ্তানিকারকরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন । আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে নতুন কোন কর্মসংস্থান হচ্ছে না বরং কর্মরত শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা রয়েছে । 

কিন্তু গ্যাসের এই মারাত্মক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিশেষ করে জ্বালানী মন্ত্রণালয়, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা এবং তিতাসের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোন ধরণের পরিকল্পনা কিংবা রুপরেখা প্রদান করা হয়নি। এমতাবস্থায় সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় অতিসত্বর যে কোন মূল্যে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করে টেক্সটাইল এবং পোশাক খাতে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে । সরকারের উচিৎ অনতিবিলম্বে সিস্টেম লস বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা, তিতাসসহ গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে মুনাফা অর্জন পরিহার করা এবং গ্যাস সরবরাহের সকল পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করা। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত