গেটে তালা আর ভেতরে স্লোগান ‘অবৈধ কালো আইন মানব না, আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম, লেগেছে রে লেগেছে রক্তে আগুন লেগেছে। প্রশাসনের মূল কেন্দ্র সচিবালয়ে কয়েকশ কর্মকর্তা কর্মচারী এই বিক্ষোভে অংশ নেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে কর্মরতদের এ প্রতিবাদ দিন দিন বড় আকার ধারণ করছে। গতকাল রবিবার ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদনের প্রতিবাদে সচিবালয়ের ভেতরে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ-মিছিল হয়। সচিবালয়ে প্রবেশের গেটেও তালা দিয়ে রাখা হয়।
৬ নম্বর ভবনের নিচ থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি বেশ কয়েকটি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ভবনেও যায়। আইনটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এটিকে ‘কালাকানুন’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি করেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের ব্যানারে এ আন্দোলন হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ সংশোধন করে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সঙ্গেও দেখা করেন আন্দোলনকারীরা। এদিকে
‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে নিবর্তনমূলক ও কালাকানুন আখ্যায়িত করে বাতিলের দাবিতে সচিবালয়ে কর্মচারীদের আন্দোলনের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় এ অধ্যাদেশ জারি হয়। এর আগে গত ২২ মে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ সংশোধন করে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।
গতকাল সকাল থেকে সচিবালয়ে বিভিন্ন দপ্তরের কয়েকশ কর্মচারী কাজ রেখে প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন। আন্দোলনরত কর্মচারীরা বলেন, নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই আন্দোলনে এসেছেন। আলাদা করে ডাকার দরকার হয়নি। তাদের অভিযোগ, সাড়ে চার দশক আগের বাতিল হয়ে যাওয়া ‘নিবর্তনমূলক ধারা’ সংযোজন করে অধ্যাদেশের খসড়াটি করা হয়েছে। অধ্যাদেশের খসড়ায় শৃঙ্খলা বিঘ্ন, কর্তব্য সম্পাদনে বাধা, ছুটি ছাড়া কর্মে অনুপস্থিত, কর্তব্য পালন না করার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুতির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সহজেই শাস্তি, এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। অধ্যাদেশের খসড়াটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যায়িত করে তা পুনর্বিবেচনারও দাবি করছেন কর্মচারীরা।
সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে সমাবেশ করেন কর্মচারীরা। সেখানে দাবি পূরণ না হলে সোমবার সচিবালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ সময় কয়েক নেতা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর সেখান থেকে মিছিল নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের দপ্তরে যান। অবশ্য তখন তিনি দপ্তরে ছিলেন না। এরপর সেখান থেকে বের হয়ে তারা সচিবালয়ে মূল ফটকের কাছে যান। এ সময় কিছুক্ষণের জন্য ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সেখানে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি মো. বাদিউল কবীর অনুমোদিত অধ্যাদেশের খসড়াকে কালাকানুন আখ্যায়িত করে বলেন, এটি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
সংযুক্ত পরিষদের এ আন্দোলন নিয়ে বেশ কয়েক যুগ্মসচিব, উপসচিবের সঙ্গে কথা হলে তারাও এ আন্দোলনকে যৌক্তিক বলেন। তারা বলেন, আমাদের পক্ষে এমন প্রকাশ্যে আন্দোলন করা সম্ভব নয়, তবে এ আন্দোলন সঠিক। এটা কোনো কথা হতে পারে না। জোর করে আইন চাপিয়ে দিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করা হবে। কেউ কেউ বলেন, সাংবাদিকদের উচিত এই আইন বন্ধে বেশি বেশি সংবাদ প্রচার করা।
এদিকে সচিবালয়ে নানা দাবি নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য এ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গতকাল রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ কমিটি পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সভাপতি করে কমিটিতে একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-১ অধিশাখা), যুগ্মসচিব (বিধি-১ অধিশাখা), যুগ্মসচিব (মাঠ প্রশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়োগ ও নবনিয়োগ অধিশাখা), যুগ্মসচিব (প্রশাসন অধিশাখা), মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি (যুগ্মসচিবের নিচে নয়), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সচিবালয় ও কল্যাণ অধিশাখা) সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত ও সুপারিশ দেবে।
কমিটি প্রতি মাসে একবার সভায় মিলিত হবে এবং প্রয়োজনে কর্মচারীদের উপযুক্তসংখ্যক প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারবে। কমিটি প্রয়োজনে সদস্য কোঅপ্ট করতে পারবে।
আন্দোলনের মধ্যেই অধ্যাদেশ জারি : অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের চারটি বিষয়কে অপরাধের আওতাভুক্ত করে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী যদি এমন কোনো কাজে লিপ্ত হন, যা অনানুগত্যের শামিল বা যা অন্য যেকোনো সরকারি কর্মচারীর মধ্যে অনানুগত্য সৃষ্টি করে বা শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি করে, অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে সমবেতভাবে বা এককভাবে ছুটি ছাড়া বা কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া নিজ কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকেন বা বিরত থাকেন বা কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থ হন, অন্য যেকোনো কর্মচারীকে তার কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকতে বা বিরত থাকতে বা তার কর্তব্য পালন না করার জন্য উসকানি দেন বা প্ররোচিত করেন এবং যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তার কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করেন, তাহলে তিনি অসদাচরণের দায়ে দন্ডিত হবেন। আর এসব অভিযোগের শাস্তি হিসেবে দোষী কর্মচারীকে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া, চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করা যাবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে শুনানি করতে ইচ্ছুক কি না, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাও নোটিসে উল্লেখ করবেন। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারণ দর্শালে তা বিবেচনার পর এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত থাকলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা অভিযোগ গঠনকারী ব্যক্তি তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে তাকে কেন দন্ড আরোপ করা হবে না, সে বিষয়ে আরও সাত কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। কারণ না দর্শালে তা বিবেচনার পর অথবা কারণ না দর্শালে এর ভিত্তিতে দন্ড আরোপ করা যাবে। দন্ড আরোপ করা হলে দোষী কর্মচারী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। আপিলকারী কর্তৃপক্ষ দন্ড বহাল, বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারবে। তবে রাষ্ট্রপতির দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না। যদিও আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারী। রাষ্ট্রপতি যেরূপ উপযুক্ত মনে করবেন সেরূপ আদেশ দিতে পারবেন।
