কনস্টেবলকে মারধর করে ৩০ রাউন্ড বুলেট নিয়ে গেছে জুয়াড়িরা

আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ০৯:১১ এএম

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়িতে চলমান গণেশ পাগল মেলা বা কুম্ভমেলায় এক পুলিশ কনস্টেবলের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সময় তাকে মারধর করে ৩০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছিনিয়ে নিয়েছে জুয়াড়িরা। 

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওই বুলেটগুলি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। হামলার শিকার পুলিশ কনস্টেবল মেহেদী হাসান মাদারীপুর পুলিশ লাইন্সে কর্মরত রয়েছেন। এ ঘটনায় গণেশ পাগল সেবাশ্রমের সভাপতি মিরন বিশ্বাস ও কনস্টেবল মেহেদীসহ আরও দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

স্থানীয় ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত কুম্ভমেলার মাঠে ডিউটি করেন পুলিশ কনস্টেবল মেহেদী। পরবর্তী দিন ভোর ৪টায় সিভিল পোশাকে তিনি মেলার জুয়ার আসরে যান, যেখানে জুয়াড়িদের সঙ্গে তাঁর হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে তার সাথে থাকা সরকারি শর্টগানের ৩০ রাউন্ড গুলি নিয়ে পালিয়ে যায় জুয়াড়িরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সরেজমিনে দেখা গেছে, মেলার মূল মাঠে সারি সারি জুয়ার আসর বসেছে। প্রায় ২০টি জুয়ার খোঁট রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন মডেলের ছবি দিয়ে বড় জুয়ার আসর গড়ে তোলা হয়েছে। ছোটখাটো জুয়ার খোঁট হিসেবে চরকির ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিটি আসরে ৫-৬ জন জুয়াড়ি নিয়মিত কাজ করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই জুয়ার আসর পরিচালকদের হাতে প্রচুর টাকা জমা হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তবে সাংবাদিকদের ক্যামেরা দেখে কয়েকটি আসর ফেলে জুয়াড়িরা দ্রুত পালিয়ে যায়।

অপরদিকে মেলার কালী মন্দির এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন ও বিক্রির ঘটনা চোখে পড়ে। সেখানে শত শত মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী একত্রে বসে গাঁজা সেবন করছেন। যদিও মাদক সেবন ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ, তবুও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ কার্যক্রম না থাকার কারণে সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

মেলার মাঠে জুয়া পরিচালনাকারী মাসুদ নামের এক ব্যক্তি জানান, জুয়ার খোঁটের বিষয়টি কমিটির লোকজন জানেন, তিনি নিজে কিছু জানেন না। তার কাজের বিনিময়ে মাসিক ২ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অন্যদিকে কালিপদ নামে আরেক জুয়ারি বলেন, এই আসরটি কদমবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রসাদ মেম্বার বসিয়েছেন, তিনি নিজে শুধু দাঁড়িয়ে আছেন এবং কথা বলেননি।

এ বিষয়ে কদমবাড়ি গণেশ পাগল সেবাশ্রমের সভাপতি মিরন বিশ্বাস বলেন, জুয়ার আসর বসার ব্যাপারে কমিটির কেউ অবগত নয়। যতবার সম্ভব পুলিশের সহায়তায় আমরা আসর ভেঙে দিয়েছি। 

গাঁজা সেবনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা লালনের মাজারে যেমন চলে, এখানে তেমনই চলে। প্রশাসনও জানে, আমরা চেষ্টা করি তবে প্রশাসন পারছে না, আমরা কী করতে পারি।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘পুলিশ কনস্টেবলের ওপর হামলার বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য আমরা ঘটনাস্থলে রয়েছি। জুয়া ও গাঁজা সেবন নিয়ন্ত্রণে আমরা যতটুকু পারি চেষ্টা করছি। জনসমাগমের কারণে কন্ট্রোল করা কঠিন হলেও আমাদের লেভেল থেকে এটি জিরো টলারেন্স।’

উল্লেখ্য, গত বুধবার থেকে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়িতে শুরু হয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী কুম্ভমেলা বা গণেশ পাগলের মেলা, যা স্থানীয়ভাবে কামনার মেলা নামে পরিচিত। আগামী শনিবার (৩১ মে) পর্যন্ত চলবে চার দিনব্যাপী এই মেলা। মহামানব শ্রী শ্রী গণেশ পাগলের স্মরণে অনুষ্ঠিত এই ধর্মীয় উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য ভক্তরা অংশগ্রহণ করেন। মেলা প্রাঙ্গণে সহস্রাধিক দোকান বসে থাকে এবং প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ মেলায় উপস্থিত হন, কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ মেলার সূচনা হয় রাত থেকেই, যেখানে জয় ডংকা ও নানা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে ‘জয় হরিবল’ ও ‘জয়বাবা গণেশ পাগল’ ধ্বনি মুখরিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধু-সন্ন্যাসী ও ভক্তরা বাস, ট্রাক, ট্রলার ও পদব্রজে মেলা প্রাঙ্গণে আসেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শতাব্দী প্রাচীন এই মেলা কদমবাড়ির দিঘীরপাড় এলাকার মহামানব শ্রী শ্রী গণেশ পাগল সেবাশ্রমে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। হিন্দু শাস্ত্রমতে, সত্য যুগে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনে অমৃতসুধা চার কুম্ভ পাত্রে হরিদ্বার, প্রয়াগ, উজ্জয়িনী ও নাসিক স্থাপিত হয়। এরপর ভারতীয় মুনি ঋষিরা কুম্ভ মেলার আয়োজন শুরু করেন। প্রায় একশ বছর আগে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে ১৩ জন সাধু ১৩ সের চাল ও ১৩ টাকা নিয়ে রাজৈরের কদমবাড়িতে এই মেলার প্রথম আয়োজন করেন, যা থেকে এই ঐতিহ্য বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত বয়ে আসছে। মেলার মূল অনুষ্ঠান এক রাতের জন্য হলেও কখনো কখনো সপ্তাহব্যাপীও চলে। এখানে ১০৮টি দেবদেবতার মন্দির রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত