বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান নিশ্চিত ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে ২০২২ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করেছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। গত মঙ্গলবার রাতে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। অধ্যাদেশে জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সমুন্নত রাখা, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ শব্দগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি জারির আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের সামনে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়।
অধ্যাদেশ নিয়ে দেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করেছে বলে প্রধান উপদেষ্টার প্র্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে। পত্রিকাগুলো বলেছে, মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও মুজিবনগর সরকারের অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে, যা আসলে মিথ্যাচার। প্রেস উইং বলেছে, এ মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য।
অধ্যাদেশে যা আছে : জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অধ্যাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের সদস্যরা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। মুজিবনগর সরকার গঠনে যারা সহযোগিতা করেছেন, তারা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’।
‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ বিষয়ে বলা হয়েছে, যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন এবং যেসব বাংলাদেশি বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীনে কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা দূত, মুজিবনগর সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ (জাতীয় পরিষদের সদস্য) বা এমপিএ (প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য), যারা পরবর্তী সময়ে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শিল্পী ও কলাকুশলী এবং দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সব বাংলাদেশি সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যরা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা।
নতুন অধ্যাদেশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’র সংজ্ঞায় আরও বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা দেশের ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এরূপ সব বেসামরিক নাগরিক (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও সেই সরকারস্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ-কমান্ডো, কিলো ফোর্স এবং আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা।’
নতুন অধ্যাদেশের বিষয়ে কয়েকটি পত্রিকা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেছেন, মুজিবনগর সরকারে যারা ছিলেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। যারা সশস্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, যারা পরিচালনা করেছেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। তবে ওই সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে যে সংজ্ঞা ছিল, সেটাই এখন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ ও ২০২২ সালে ওই সংজ্ঞায় পরিবর্তন ঘটায়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী দুয়েরই সম্মান, মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা একই থাকবে। এ সংজ্ঞার ফলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা সহজ হবে বলেও জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কর্মরতরা এবং কূটনীতিকরা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা।
শেখ মুজিব, চার নেতাসহ মুজিবনগর সরকারের বিষয়ে জারি করা অধ্যাদেশকে নিয়ে মিথ্যাচার হচ্ছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘মুজিবনগর সরকারের অধীনেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। অধ্যাদেশে সবার মর্যাদাই রক্ষা করা হয়েছে। যারা মিথ্যাচার করছে, তারা অধ্যাদেশটি না পড়েই তা করছে। মিথ্যা সংবাদ প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের প্রতিবাদ : অন্তর্র্বর্তী সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে খুবই উদার মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেছেন, যারাই এখন থেকে ভুল সংবাদ প্রকাশ করবে, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করবে, মানুষকে বিভ্রান্ত করবে সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, ‘সমকাল, যুগান্তর, ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতাসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভুয়া, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও সংবাদ সম্মেলন করে ব্যাখ্যা দিয়েছে। আমরাও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে একমত। ওনারা বলেছেন, মুজিবনগর সরকারে যারা ছিলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা।’
সংবাদমাধ্যমের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ সংস্কৃতি উপদেষ্টার : অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ মুজিবনগর সরকারের সব সদস্যকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নেই।’
উপদেষ্টা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বাতিল একটা ফেইক নিউজ। নতুন অধ্যাদেশে মুজিবনগর সরকারের সব সদস্যকে মুক্তিযোদ্ধার স্পষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া আছে।’
গেজেট নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা চায় বামজোট : মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা-সংক্রান্ত সম্প্রতি প্রকাশিত গেজেট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটের নেতারা বলেন, সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যেন মুক্তিযুদ্ধ ও এর চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। গতকাল বুধবার বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সভা থেকে এ দাবি করা হয়। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানা যায়।
সভায় জুন মাসের শেষ সপ্তাহে রাখাইন করিডর ও চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের লিজ দেওয়ার বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘রোড মার্চ’ কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানানো হয়। নেতারা বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে করিডর ও বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার তৎপরতা জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। অবিলম্বে এই প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানানো হয় সভা থেকে।
