মেহেরপুরে শিল্প ও বাণিজ্য মেলার নামে চলছে রমরমা জুয়া। হাইকোর্ট মেহেরপুরে শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমতি দিয়েছিল ১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত। কিন্তু সেই অনুমতির দোহাই দিয়ে গত ৩ জুন থেকে পৌর নতুন বাস টর্মিনালে চলছে এই জুয়া আসর। মেলার উদ্বোধন করেন মেহেরপুর জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বিএনপি নেতা আহসান হাবিব সোনা।
মেলার নামে জুয়ার আসর প্রশ্নে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক সিফাত মেহনাজ বলেন, ‘প্রশাসন শর্ত সাপেক্ষে শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমতি দিয়েছে। সেখানে র্যাফেল ড্রর নামে জুয়া খেলা চলছে শুনেছি। প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’ মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি সাইদুর রহমান রাজ্জাক বলেন, হাইকোর্ট ১ মাসের জন্য শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমতি দিয়ে সময় বর্ধিতকরণে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছিল। হাইকোর্টের সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মেলা চলছে। মেহেরপুর পৌর প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তরিকুল ইসলাম বলেন, পৌর বাস টার্মিনাল বন্ধ করে কোনো মেলা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। মেহেরপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বকুল বলেন, মেহেরপুরে শিল্প ও বাণিজ্য মেলার নামে যে জুয়ার আসর চলছে সেখানে শিল্প ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট কোনো স্টল নেই।
সরেজমিন দেখা যায়, কোভিড স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে শত মানুষ এই জুয়া আসরে আসছেন। প্রবেশ ফি ২০ টাকা। প্রতিদিন শতাধিক ইজিবাইকে করে গ্রাম-গঞ্জে লাটারির টিকিট বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আয়োজকরা। এই লটারি কিনে প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, স্বর্ণালঙ্কারের সেটসহ ছোট-বড় নানা পুরস্কারের চটকদার ঘোষণা দিয়ে প্রতিদিন মাইকে প্রচার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ স্বপ্নচূড়া ফাউন্ডেশনের নামে এই মেলার অনুমতি নিয়েছে। জেলা প্রশাসক শর্ত জুড়ে দিয়ে সেখানে শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু শর্ত লঙ্ঘন করে মেলার নামে সেখানে প্রকাশ্যে জুয়া আসর চলছে। মেলার নামে পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। মেলাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েছে। মধ্যরাত পর্যন্ত এই আসর চলায় ছিনতাই, চুরি ও ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। লটারিতে ঝুঁকে পড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা।
গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামের রাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি মোটরসাইকেল পুরস্কারের মাইকিং শুনে ২ হাজার টাকা দিয়ে লটারির ২০টি টিকিট কিনে সব টাকা খুইয়েছেন। মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষার্থী মাসুম আলী বলে, ‘মোটরসাইকেল পুরস্কার পাওয়ার আশায় মায়ের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে টিকিট কিনলাম। কিন্তু কিছুই পাইনি। এদিকে মেলায় প্রতিদিন জনসমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন একেএম আবু সাঈদ বলেন, ‘সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মেলায় অনেক মানুষের সমাগম হয়। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মাস্ক পরা উচিত। ৪ জুন থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মেলার কারণে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য হচ্ছে।’এ ব্যাপারে মেলার আয়োজক স্বপ্নচূড়া ফাউন্ডেশনের সভাপতি আশিকুর রহমান শিশিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি মেলা নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমন্বয়ক ও মেহেরপুর জেলার সংগঠক অ্যাডভোকেট শাকিল আহমেদ বলেন, ‘মেলার নামে অনৈতিক কর্মকা- গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। আমরা সুন্দর সমাজ গড়তে চাই। মেলার অনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে এনসিপির কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মাকসুদা খানমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
