শিশুর অধিকার রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২০০২ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ১২ জুন ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০ দেশে এ দিবস পালন করা হয়। যে বয়সে একটি শিশুর বই হাতে বিদ্যালয়ে দুরন্ত শৈশব অতিবাহিত করার কথা, সেই বয়সে তাকে ইটভাটা বা শিল্পকারখানায় মানবেতর শ্রম দিতে হচ্ছে। সব ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও, সমাজে অহরহ দেখা যায় শিশুশ্রমের করুণ চিত্র। হোটেল, মোটেল, লঞ্চ, বাস, ইটভাটা, পাথর ভাঙা, মোটর গ্যারেজ, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, কল-কারখানা, বাসাবাড়ি, মিষ্টি ও বিস্কুট ফ্যাক্টরি, তামাক শিল্প, চামড়া শিল্প, চা শিল্প, ভারী শিল্প ইত্যাদিতে শিশুশ্রমের নির্মম চিত্র। দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারের সন্তানরা দু’বেলা ভাত মুখে দেওয়ার জন্য নিরুপায় হয়ে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রথম ও প্রধান কারণ হলো ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থা’।
শিশুর বয়সসীমা ও শিশুশ্রম নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে চিলড্রেন অ্যাক্ট-এ শিশুর বয়স ১৬ বছর করা হয়। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে মতামত রাখা হয়েছিল, ১৮ বছর হবে শিশুর সর্বোচ্চ সময়কাল। ১৯৯৪ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুনীতিতে শিশুদের বয়স ১৪ বছর করা হয়েছিল। ২০০৩ সালের ১ জুন শিশুর বয়সসীমা আবার ১৬ নির্ধারণ করা হয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রমআইন ২(৬৩) ধারায় ‘শিশু’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন কোন ব্যক্তি। ২০১১ সালে জাতীয় শিশুনীতি ২-১ ধারায় শিশু বলতে ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো ব্যক্তিকে বোঝায়। শ্রম অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৬৯ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। ইউনিসেফের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে শিশুর সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি। ৯০ শতাংশ প্রাথমিকভাবে স্কুলে গেলেও শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই অর্ধেকের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ শিশু শ্রম দিচ্ছে কেবল খাদ্যের বিনিময়ে।
লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০-২৫ লাখ শিশু আছে যাদের পথশিশু বলা হয়। এসব শিশু অভাবের তাড়নায় ভেঙে যাওয়া পরিবার থেকে বেরিয়ে পথে নেমেছে। এসব শিশু রাত কাটায় বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, ফুটপাত, পার্ক, রাস্তা কিংবা খোলা জায়গায়। এরা পথশিশু। এরা পথেই থাকে, পথেই জীবিকা নির্বাহ করে। এদের সবার বয়স ৫-১৮ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন প্রকার অপরাধ, অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে, কেউ কেউ হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত। কেউ পাচার চক্রের পাল্লায় পড়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়। একপ্রকার দুষ্টচক্রের সিন্ডিকেট এসব পথশিশুকে নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে।
শিশুশ্রম বন্ধে করণীয় : ১) শিশুশ্রমকে বলা হয় দারিদ্র্যের ফসল। শিশুশ্রমের মূলে রয়েছে দারিদ্র্য। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে প্রথমে দারিদ্র্য নিরসন করতে হবে। ২) অমানবিক শিশুশ্রম বন্ধে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, অন্যের শিশুকে নিজের সন্তানের মতো মনে করতে হবে। ৩) প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৪ বছরের কম শিশুদের সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। ৪) শিশুশ্রম বন্ধে গ্রাম ও শহরভিত্তিক পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অভাবের কারণে যে শিশুরা শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের শিশুভাতা প্রদান করতে হবে। ৫) শিশুশ্রম নিরসনে যেসব আইন রয়েছে তা বাস্তবায়ন এবং স্বল্প, মধ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। সবার সমন্বিত উদ্যোগে শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব। ৬) শিশুশ্রম নিরসনের জন্য কোথায় কোথায় শিশুশ্রম হচ্ছে তা খুঁজে বের করা দরকার এবং গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। ৭) দেখা যায় অনেক মালিক আছেন যারা বেশি বেতন দিতে হবে এ জন্য বড়দের কাজে রাখেন না। শিশুদের দিয়ে কাজ করান, এসব মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৮) জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মকৌশলে শিশুশ্রমকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে। ৯) শ্রমজীবী প্রতিটি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ১০) শিশুশ্রম এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের ৪৭ লাখ শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত। এটি সরকারের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধা। কিন্তু আশার কথা হলো, সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুকে শিশুশ্রম থেকে প্রত্যাহারে ৬ মাসের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ৪ মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এসব শিশু প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে উপবৃত্তি পাবে। এক লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে প্রত্যাহার করা হবে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম থেকে শিশুদের প্রত্যাহার করা হবে।
আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। বিপুল পরিমাণ জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে সার্বিক উন্নতি মুখ থুবড়ে পড়বে। শিশুদের শ্রম থেকে মুক্তি দিয়ে ফিরিয়ে দিতে হবে দুরন্ত শৈশব, করে তুলতে হবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত। শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবধর্মী কার্যকর পদক্ষেপ, প্রয়োজন গণসচেতনতা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
