চাপে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কমেছে গম আমদানি

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৫, ০৬:৪৩ এএম

গমের বৈশি^ক দুই নির্ভরযোগ্য উৎস রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ চলমান থাকলেও দুই বছর ধরেই কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই আমদানি হচ্ছে গম। তবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গমের ব্যবসায় জড়িত কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন সরকারের ‘বিধিনিষেধের’ আওতায় থাকায় ভোগ্যপণ্যটির আমদানি কমেছে বলে জানা গেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে (১ জুলাই ২০২৪-৩ জুন ২০২৫) এখন পর্যন্ত গম আমদানি হয়েছে ৫৫ লাখ ৫৬ হাজার টন, যা গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৬৬ লাখ ২৮ হাজার টন। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ গম আমদানি করা হয়েছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকে জানা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থবছরের শেষ হওয়া পর্যন্ত (আগামী ৩০ জুন) আমদানি আরও খানিকটা বাড়লেও আমদানি এবার গত বছরের চেয়ে খানিকটা কমই থাকবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত বছর বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার টনের বেশি গম আমদানি হয়েছিল, যা গত ৩ জুন পর্যন্ত সময়ে হয়েছে ৫০ লাখ ৯০ হাজার টন। গত বছর সরকারিভাবে আমদানি হয়েছিল ৭ লাখ ৮৪ হাজার টনের বেশি গম, যা এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৬৬ হাজার টনে ঠেকেছে।

বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেরও আমূল পরিবর্তন ঘটে। নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসে। নির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ সরকারকে নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় এ সরকারকে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা দেশে গম আমদানি, প্রক্রিয়াজাত, সরবরাহ ও বিপণনে প্রথমসারির ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। সরকারের পদক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়া, একদিকে লিকুইডিটি ক্রাইসিস অন্যদিকে এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোর বাড়তি মার্জিন চাওয়াসহ নানা কারণে এ প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে ভোগ্যপণ্যটি আমদানি করতে পারছে না বলে জানা গেছে। এর প্রভাবেই এবার বেসরকারি খাতের গমের আমদানি কমেছে বলে জানা গেছে।

সমস্যাগ্রস্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের নানা পলিসির কারণে তারা চাপের মধ্যে থাকায় স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বাধার মুখে পড়ছে। যার একটা প্রভাব পড়েছে গমের আমদানিতে। গত আট মাসে নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিকভাবেও দুর্বল করে রাখা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। এর বাইরে অবশ্য বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই স্বাভাবিকভাবেই গমের আমদানি করতে পারছে বলে জানা গেছে। স্বাভাবিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মেঘনা গ্রুপ। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) তাসলিম শাহরিয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চললেও গমের আমদানিতে কোনো সমস্যা নেই। বছর দুয়েক ধরে এ দুটি দেশ থেকে বেশিরভাগ গম আমদানি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘অর্থবছর শেষে গমের আমদানি আরও কিছুটা বাড়বে। কারণ, অনেক প্রতিষ্ঠানের গম এখনো দেশে প্রবেশ করছে।’ তবে দেশে গমের চাহিদা খানিকটা পড়তির দিকে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চললেও বাংলাদেশ গম আমদানির সিংহভাগ এ দুটি দেশ থেকেই হচ্ছে। একটা সময় ভারত থেকে ব্যাপকহারে গম আমদানি হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরপরই দেশটি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, যা এখনো বহাল রয়েছে। যে কারণে ২০২২ সালের শেষদিকে গমের আমদানি নিয়ে ব্যাপক জটিলতার মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। ২০২২ সালের মে মাসে ভারত গম রপ্তানিতে আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা দিলে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি পড়ে দেশের গম সরবরাহ। এর আগে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের দুই ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে পরিচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলেও একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব।

এ কারণে ২০২১-২২ অর্থবছরের কয়েক মাস দেশে গম আমদানি হয়নি এবং এ আমদানির পরিমাণ তলানিতে নেমেছিল। সে সময়ে আমদানির পরিমাণ নেমে আসে ৪০ লাখ টনে। এ সংকট পরের অর্থবছরেও দেখা যায়। যখন কি না গমের আমদানি আরও কমে ৩৮.৭৫ লাখ টনে নেমে আসে। এ অচলাবস্থা কেটে যায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এবং সে সময় স্বাভাবিকভাবে সরকারি-বেসরকারিভাবে গমের আমদানি হয় ৬৬ লাখ টনের বেশি। এবার সেই ধারাবাহিকতা থাকলেও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারণে এ আমদানি খানিকটা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা রয়েছে ৭০-৭৫ লাখ টন। দেশে ১০ লাখ টনের কাছাকাছি উৎপাদন এবং বাকিটা আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারিভাবে রাশিয়া, ইউক্রেনের পাশাপাশি রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা থেকেও গম আমদানি হচ্ছে।

গমের আমদানি স্বাভাবিক তাই নয়, দামও স্বাভাবিক রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যে গমের দাম টনপ্রতি ৪০০ ডলার ছুঁয়েছিল, তা এখন ২৫০ ডলারের নিচে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মে মাসের এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাশিয়ার গমের এফওবি মূল্য টনপ্রতি ২৪৮ ডলার, ইউক্রেনের গম ২৪৬ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের গম ২২০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থিতিশীল রয়েছে স্থানীয় আটার দামও। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই আটার দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) অনুসারে, ২০২২ সালের মার্চে প্রতি কেজি খোলা আটার দাম ছিল ৩৫ টাকার মধ্যে এবং প্যাকেট আটা ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। যুদ্ধের প্রভাবে খোলা আটা ৫৫ ও প্যাকেট আটা ৬৫-৭০ টাকায় উঠে যায়, যা দুই বছর ধরে খোলা আটা ৪০-৪৫ ও প্যাকেট আটা ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সরকার ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, ডলারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে গমের দাম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগের দামে ফেরেনি আটার দাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত