দেশে রোগী অনুপাতে করোনা পরীক্ষা বাড়ছে না। গত তিন মাসে যেখানে করোনা রোগী বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি, সেখানে নমুনা পরীক্ষা বেড়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। অথচ গতকাল রবিবারও এ বছরের সর্বোচ্চ ২৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ও মারা গেছে একজন।
এর আগে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ১০ দিনের মধ্যে আবার করোনা পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দেয়। সেদিন জানানো হয়, গত বুধবার ১০ হাজার আরটি-পিসিআর কিট ও তারও আগে ২৮ হাজার দ্রুত করোনা শনাক্তকরণ কিট এসেছে। সেসব কিট বৃহস্পতি-শুক্রবারের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পৌঁছানোর কথা। তবে পরীক্ষা হবে সীমিত পরিসরে। প্রাথমিকভাবে যেসব মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে আরটি-পিসিআর ল্যাব রয়েছে, সেখানেই এই পরীক্ষা শুরু হবে।
গতকাল রাজধানীর তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও এখনো পরীক্ষা শুরু হয়নি। রোগীর চাপও কম। তারা পরীক্ষার জন্য কিট পেয়েছেন ও ল্যাবও চালু রয়েছে। তবে পরীক্ষার জনবল নেই। অন্যান্য বিভাগের জনবল দিয়ে পরীক্ষা শুরু করতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেছেন, হাসপাতালের স্থানীয় জনবল দিয়ে আপাতত পরীক্ষা শুরু করা যাবে। কিন্তু প্রাদুর্ভাব বাড়লে ও প্রতিদিন নমুনা পরীক্ষা করতে হলে আলাদা জনবল ছাড়া সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরীক্ষা নির্ভর করে রোগীর ওপর। এখনো দেশে অত রোগী নেই। পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট কিট আছে। যেখানে যেখানে ল্যাব চালু আছে সেখানে পাঠাচ্ছি আগে। আমরা চাচ্ছি সচেতনতা বৃদ্ধি করতে। রোগীর সংখ্যা কম। এজন্য পরীক্ষা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে না। কোথায় ল্যাবের কী অবস্থা, কতটা চালু আছে, এসব জানতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। দুই-একদিনের মধ্যেই পুরো তথ্য পেয়ে যাব।
জনবলের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, করোনার যে পরিমাণ চাপ, সেটা সামলাতে সরকারি টেকনোলজিস্ট যা আছেন, আশা করছি সেটা দিয়েই হবে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ বলেন, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ফোন করে জেনে নিতে হবে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে কি না। আমরা কিট দিচ্ছি। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে মোটামুটি দিয়েছি। ঢাকার বাইরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতেও দিচ্ছি। অনেক স্থানে কিট পৌঁছে গেছে।
তবে এখনই গণহারে করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করবে। গণপরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এখন তো প্যানডেমিক না। যদি একজন মানুষের তিন দিনের মধ্যে ভালো না হয়, খারাপের দিকে যায়, তখন চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবে। তারা অবস্থা দেখে করোনা অথবা ডেঙ্গু পরীক্ষা দিতে পারে। সেটা নির্ভর করে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের ওপর। ঢালাও পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। লক্ষণ দেখে পরীক্ষা। আগে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে হবে। সেটা যদি নেগেটিভ হয়, কিন্তু লক্ষণ থাকে, তখন তার নমুনা আরটি-পিসিআর ল্যাবে পাঠানো যেতে পারে। এতে সময়ও বাঁচবে। কারণ অ্যান্টিজেন পরীক্ষার রেজাল্ট সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায়। আর যার নেগেটিভ হবে, কিন্তু জ্বর ও কাশি আছে, তখন তার স্যাম্পল আরটি-পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে। সেখানে রেজাল্ট আসতে ২৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বিভিন্ন দেশেও করোনা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপকহারে যে হচ্ছে, তা নয়। যেহেতু এই ভাইরাস যত বেশি ছড়ায়, ততই তার ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়। হয় সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়ে অথবা কমে। রোগতত্ত্ববিদদের এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তবে এখনো কোথাও এই উপধরন ব্যাপক আকারে বা অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্ষতি করছে, সেটা দেখা যায়নি। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
বছরের সর্বোচ্চ রোগী : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ২৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ২৯১টি। নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী শনাক্তের হার ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। রোগী ও নমুনার এই সংখ্যা এ বছরের সর্বোচ্চ।
এ নিয়ে এ বছর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৮৮ জনে। তাদের মধ্যে ১৩০ জনই জুন মাসের প্রথম ১৫ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন।
এ সময় করোনায় একজন মারা গেছেন। এ নিয়ে এ বছর মোট চারজন মারা গেলেন। মারা যাওয়া ওই রোগী একজন পুরুষ, তার বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তিনি ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গত একদিনে ঢাকায় ৬০টি নমুনা পরীক্ষায় ১২ জন, চট্টগ্রামে ১৭৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ১১ জন, রাজশাহীতে ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে ২ জন এবং সিলেটে ৮টি নমুনা পরীক্ষা করে এক জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
রোগী বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ, পরীক্ষা ১৫ শতাংশ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ বছরের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জানুয়ারি-মার্চ, অর্থাৎ তিন মাসের তুলনায় গত আড়াই মাসে (এপ্রিল-১৫ জুন) দেশে করোনা রোগী বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু পরীক্ষা বেড়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ।
বছরের প্রথম তিন মাসে ১ হাজার ৫৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ও রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮৫ জন। পরের আড়াই মাসে এপ্রিল-১৫ জুন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩১টি ও রোগী শনাক্ত হয়েছে ২০৩ জন। অর্থাৎ গত আড়াই মাসে রোগী বেড়েছে ১১৮ জন বা ১৩৯ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু পরীক্ষা বেড়েছে ২৩৬টি বা ১৫ শতাংশ।
পরীক্ষা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে হাসপাতালগুলো : রাজধানীর হাসপাতালগুলো করোনা পরীক্ষা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলেছেন, রোগীর চাপ নেই। তাই পরীক্ষাও হচ্ছে না। তারা আশা করছেন শিগগির পরীক্ষা শুরু করা যাবে।
এ ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শফিউর রহমান বলেন, আমাদের সব প্রস্তুতি আছে। দু’একদিনের মধ্যে পরীক্ষা শুরু করতে পারব। রোগীর চাপ নেই। বুথ, রি-এজেন্ট, কিট, লোকবল সব প্রস্তুত। রোগীর যেহেতু চাহিদা নেই, তাই এখনো শুরু করা হয়নি। তবে সব প্রস্তুত আছে। শিগগির শুরু করতে পারব।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মাজহারুল শাহিন বলেন, হাসপাতাল ও কলেজ দুপক্ষ মিলেই করোনা পরীক্ষা করি। অচিরেই পরীক্ষা শুরু হবে। আজ (গতকাল রবিবার) দিনের শেষে কিছু কিট পেতে পারি। মেশিনও আছে। কিন্তু আগেরবার কোভিডের সময় পরীক্ষার জন্য যে জনবল ছিল, তারা নেই। ডিসেম্বরে তাদের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন জনবল নেই। করোনা পরীক্ষার জন্য বিশেষ লোকবল লাগে। আমাদের এখানে অন্য বিভাগে করোনা পরীক্ষার জন্য লোকবল আছে। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি। এটা আমাদের এখন মূল সমস্যা।
এই অধ্যক্ষ আরও বলেন, আগেরবারের কোভিডের সময়কার মেশিনগুলো আছে। সেগুলো দিয়ে আমরা অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছি। কিন্তু মূল সমস্যা জনবল। হাসপাতালের লোকজন দিয়ে হয়তো টেনে-টুনে পাঁচ-সাতদিন চালাতে পারব। কিন্তু এরপর আর হবে না।
লোকবলের ব্যাপারে এই অধ্যক্ষ পরামর্শ দিয়ে বলেন, যতদিন না লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকার বাইরে থেকে টেকনোলজিস্ট আনতে পারে। অনেকে ঢাকায় আসতেও চায়। এ রকম অসংখ্য আবেদনপত্র জমা আছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিলে আমরা নিয়মিত পরীক্ষা করতে পারব। মেশিন ও সুপারভাইজিং লোকজনও আছে। কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের নিচতলায় পাঁচ শয্যার একটি করোনা ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। কোনো উপসর্গ নিয়ে রোগী এলে সেখানে ভর্তি করানো হয় ও পরীক্ষা করানো হয়। হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য কিট আছে। কিন্তু রোগীর ওই রকম চাপ নেই।
