ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন। তাদের একজন হলেন ডিজিডিএর পরিচালক (পিআরএলে রয়েছেন) মো. ইয়াহ্ইয়া। ইয়াহ্ইয়া ও তার স্ত্রী-সন্তানের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ইয়াহ্ইয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে। কমিশন তা আমলে নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত-১-এর উপপরিচালক মাহবুবুল আলম ও সহকারী পরিচালক মো. আবু তালহার সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে।
জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধান টিম সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে ব্যাংক, বীমা, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি অফিস, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, ঢাকা বিভাগ, বিআরটিএসহ ৬০টির বেশি অফিসে চিঠি দিয়েছে।
দুদকের উপরিচালক মাহবুবুল আলমের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ইয়াহ্ইয়া চাকরিতে থাকার সময় বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। অনুসন্ধানের স্বার্থে ইয়াহ্ইয়া, তার স্ত্রী নাজনিন সুলতানা ও এক সন্তানের নামে কোনো ফ্ল্যাট-প্লট কেনা হয়ে থাকলে তার নাম, অবস্থান, দলিল নম্বর ও তারিখ, পরিশোধিত মূল্য প্রভৃতি জানা দরকার। চিঠিতে এসব তথ্য ২৯ মের মধ্যে দুদকে জমা দিতে অনুরোধ জানানো হয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পদে পদে ঘুষ দিতে এ অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় প্রতিটি ধাপে অনৈতিকভাবে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রদান, ওষুধ নিবন্ধন, নমুনা পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানির নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলে ঘুষবাণিজ্যের ওপর। বিভিন্ন কাজে ৫০০ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে। অধিদপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহির ঘাটতি, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন না করা ও ঔষধ প্রশাসনের সেবা কার্যক্রমের প্রতিটি পর্যায়ে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে টিআইবির গবেষণায়।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর গ্রিন রোডে ইয়াহ্ইয়ার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। তার বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আগারদাড়ী গ্রামে। সেখানেও তার অনেক সম্পদ রয়েছে। তিনি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে চাকরি করার সময় ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাংকে মোটা অঙ্কের অর্থ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে।
২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি টিআইবির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভেজাল ও নকল ওষুধ নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিককালে মাঠপর্যায়ে জনবল বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণসহ বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরও এ খাতটিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রদান, প্রকল্প হস্তান্তর বা স্থানান্তর, রেসিপি অনুমোদন, ওষুধ নিবন্ধন, নমুনা পরীক্ষা ও মাননিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ৫০০ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন বলা হয়, ঔষধ প্রশাসন প্রতিবছর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ওষুধের বাজার তদারকি এবং প্রতিবছর প্রায় ৭০ শতাংশ ওষুধের মান পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে ওষুধের বাজার তদারকি এবং পরিবীক্ষণে অনিয়ম-দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে।
