দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও বর্তমান বিধান পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের মুলতবি শেষে এসব কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিয়ে আলোচনায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল স্মরণ করিয়ে দেয় এর সঙ্গে পার্লামেন্টের দ্বিকক্ষ জড়িত-রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হবেন সে ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ কীভাবে হবে সেটার জন্য দ্বিকক্ষ পার্লামেন্ট নিয়ে আলোচনা করেছি। সংবিধানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে বিধান ৪৮ এর ১ অনুচ্ছেদ আছে। এই অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে।
পরিবর্তিত সংশোধিত ও সংস্কারের বিষয়টি আমরা পরে আলোচনা করব। তিনি বলেন, আমাদের আলোচনায় বিভিন্ন রকম মত থাকলেও আলোচনাটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে হচ্ছে। প্রত্যেকেই মতামত দিচ্ছে। আজকে আমরা সবাই একমত হয়েছি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পদ্ধতি রয়েছে, তা পরিবর্তন হওয়া দরকার।
প্রধানমন্ত্রী মেয়াদকাল নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকালে দুই মেয়াদের বেশি একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি দল বলেছে, একই ব্যক্তি দুবার আবার প্রধানমন্ত্রী রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলেছে। অন্য আরও কিছু প্রস্তাবও এসেছে। আমরা এই আলোচনা অব্যাহত রাখব। আগামী রবিবার সাড়ে ১০টায় আবার আলোচনা শুরু করব। আমরা আশা করব এ সপ্তাহে যেসব বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে সেগুলো প্রথমে আলোচনা করব।
দ্বিকক্ষ আইনসভা নিয়ে সবাই একমত হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে আলী রীয়াজ বলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। ১০০ সদস্যবিশিষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রেও একমত হয়েছে। তার মানে এই নয়, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে আরও সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে যেগুলো ঐকমত্য হলে পরে জানানো হবে। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে একমত হচ্ছে, যেগুলো একমত হবে না তার ভবিষ্যৎ কী হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী অনেকগুলো বিষয়ে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারব। সব বিষয়ে আমরা একমত হতে পারব না সেটা আগেও বলেছি। তারপরও যেগুলোতে একমত হতে পারব না সেগুলো আমরা ইতিবাচকভাবে তুলে ধরব। আমরা আশা করব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আমরা একমত হতে পারব।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, রাষ্ট্রপতি আজ্ঞাবহ হওয়ার কারণে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এটার সংস্কারে আসতে হবে। এ জন্য নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যে সংস্কার অপরিহার্য। বেসিক ডেমোক্রেসির কথা বলে আমরা যদি বলি অর্থের লেনদেন হয়েছে, এটাতো ইতিহাস। তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরাও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে টাকা না নিলেও, অন্য সুযোগ-সুবিধার জন্য সরকারি দলের অনুগত হবেন না, সেটা বলা যায় না। এ ইতিহাস দেশে আছে। ইলেকটোরাল কলেজ হলে টাকার খেলা হবে, ভোট কেনাবেচা হবে কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায়ও সে সুযোগ আছে তা বলতে হবে।
দেশে সুশাসন আনতে হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে বলে মনে করেন আজাদ। তিনি বলেন, ইলেকটোরাল ব্যবস্থা হলে রাষ্ট্রপতি মর্যাদা বাড়ার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কাজ এবং প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী হবে। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত ইলেকটোরাল সিস্টেমে যাওয়া উচিত। কিন্তু পরিধি ঠিক করা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে ইলেকটোরালে যোগ্যতা সম্পন্ন প্রতিনিধি আসবে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার চেষ্টার আলোচনায় অগ্রগতি মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটার প্রস্তাব আমাদের ৩১ দফায় দিয়েছি, সংস্কার কমিশনকেও বলেছি। নির্বাচন (রাষ্ট্রপতি) এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে আলোচনায় নতুন আইডিয়া ও প্রস্তাব এসেছে। যেগুলো জাতি গ্রহণ করবে বলে মনে হয়। সে জন্য আলোচনায় বসেছি। এখানে আমরা কেউ রিজিট নই, আমরা যা লিখিত প্রস্তাব দিয়েছি সেটাতে রিজিট থাকতাম তাহলে আলোচনার প্রয়োজন হতো না।
বিদ্যমান নিয়মে সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন চায় বিএনপি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা ওয়েস্টমিনস্টার টাইপের সরকার ব্যবস্থায় আছি। রাষ্ট্রপতি শাসিত নয়, ফেডারেল সরকারেও নেই, সে জায়গায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় ইলেকটোরাল, সে জায়গায় সংসদের উভয় কক্ষ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনসভার সদস্যরা ভোটার হয় (প্রাদেশিক সরকার)। এর বাইরে স্থানীয় সরকার গণ্য হয় না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উচ্চকক্ষ ১০০ ও নিম্নকক্ষের ৪০০ সদস্যদের ভোটে করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে চারটি ছাড়া (আস্থা ভোট ও অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন ও জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া) সবক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবে, সে ক্ষেত্রে এখানে গোপনীয়তার কথা আনার প্রয়োজন নেই। সেই বিষয়ে এক জায়গায় আসতে পারলে, আমার দলীয় ফোরামে আলোচনা করে এইটুকু আশ্বস্ত করতে পারি উভয় কক্ষের সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে (রাষ্ট্রপতি নির্বাচন), সেটা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে আমি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাব।
বিএনপির সংবিধান সংস্কার কমিশনের কমিটির সদস্য অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি নিয়োগের পরিবর্তন আনার চেষ্টা ভালো। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের পরে রাষ্ট্রপতি কাকে মনোনয়ন দিচ্ছি সেটাই বিষয়। স্থানীয় সরকারের ৭০ হাজার প্রতিনিধি আনার পরেও যদি চুপ্পু সাহেবের মতো লোককে মনোনয়ন দিই, আরেকজনকেও দিই, ওই দুই-তিনজন থেকেই একজন হয়ে যাবেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে আগে শিখতে হবে ওনারা কাকে বানাবেন। জনগণের কাছে ওনাদের দায়বদ্ধতা কোন জায়গায়। নির্বাচকমণ্ডলীর পরিসর বাড়ানো হলেও সমস্যার সমাধান হবে না। বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোকে মন থেকে বুঝতে হবে আমি ভালো, যোগ্য লোককে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত এটা না হবে, ততক্ষণ ফল আগের মতোই হবে।
একজন ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার বিষয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একমত হলেও এতে দ্বিমত রয়েছে বিএনপির। বৈঠকে বিএনপি বলেছে, টানা দুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গ্যাপ দিয়ে পরেরবার আবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে এমন প্রস্তাব রেখেছে বিএনপি।
সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির দাবি সরাসরি নির্বাচন হলে অনিয়ম হবে না, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পাশাপাশি মর্যাদাও বাড়বে।
নাগরিক ঐক্যের প্রাথমিক প্রস্তাবে ছিল উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। কিন্তু সংলাপে তারা অবস্থার পরিবর্তন করে ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিতে ভোটের পক্ষে মত দেয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনার সমাপ্তি টানা প্রয়োজন বলে মনে করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অন্ততপক্ষে ২২টির বেশি রাজনৈতিক দল বলেছেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর ঐকমত্যের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে অন্ততপক্ষে একমত হয়েছে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যরা গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবে।
এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, গোপন ভোটের বিষয়ে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু আপনি বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ দল বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছি, সেটা হয়তো ফিরে গেলেন। এটা পরিষ্কার করতে হবে।
আলী রীয়াজ বলেন, পরিবর্তনের পক্ষে মত থাকলেও ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি নিয়ে কিছু দলের আপত্তি আছে।
পরে তাহের বলেন, প্রক্রিয়া আগের মতোই থেকেছে, এখানে একটু পরিবর্তন হয়ে হচ্ছে গোপন ব্যালট। কিন্তু মৌলিক বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রপতি কী সরকারি দল থেকে হবে, নাকি বাইর থেকে হবে, এটা কীভাবে করব, তা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে গোপন ব্যালট থাকলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে দলীয় প্রার্থীকেই সমর্থন করবে, অন্যদের সমর্থন করবে না। সে ক্ষেত্রে মেজরোটি দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হবে। এটা আগের মত ত্রুটি থেকেই যাবে। রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের পরিধি বাড়লে নিরপেক্ষ ব্যক্তির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এনসিপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পক্ষে।
