বিশ্লেষকদের মত

রেমিট্যান্স ও জ্বালানিতে ধুঁকবে বাংলাদেশ

  • চীন-রাশিয়ার ওপর নির্ভর করছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
আপডেট : ২৩ জুন ২০২৫, ০১:৩৩ এএম

ইরান-ইসরায়েল চলমান সংঘাতের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর হামলা সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। থমথমে মধ্যপ্রাচ্য; দুশ্চিন্তায় বিশ্ব। যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, কোন পরিণতিতে রূপ নেয়; তা নিয়ে শঙ্কার অন্ত নেই। অনেকটা গায়ের জোরে ইরানে ট্রাম্পের হামলার ঘটনা বিশ্ব নেতাদের কপালে রীতিমতো চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান হামলা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এ হামলা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়া এ যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার ওপর নির্ভর করছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন কি না?

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্নে বিশ্লেষকরা বলেন, এ যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেওয়া এখন অসম্ভব কিছু নয়। রাশিয়া ও চীনের ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে এ যুদ্ধ কোন দিকে যাবে। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিশ্লেষক ও কূটনীতিক মহল মনে করছে, এ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চরম বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে বিশ্বে তো প্রভাব পড়বেই। কারণ মধ্যপ্রাচ্য হলো তেলের ভাণ্ডার। এখান থেকেই তেল বিশ্ব বাজারে যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। তার মানে যতদিন এ যুদ্ধ চলবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের কোনো সাপ্লাই আসবে না, কোনো তেলবাহী জাহাজ ওখানে যাবে না। এটা যখন হবে তখনই মূল্য বৃদ্ধি হবে। তেলের অভাবে যোগাযোগব্যবস্থা অচলাবস্থায় পড়ে যাবে। গাড়ি চলবে না, প্লেন-ট্রেন কিছুই চলবে না। আর প্লেন চলা এখন আর সেফ নয়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে এবং এতে তেলের প্রাইজ হাই হবে। এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে আমাদের রেমিট্যান্সও কমে যাবে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের বড় শ্রমবাজার। সেদিক থেকেও কিন্তু আমরা সাফার করতে পারি।’

বাংলাদেশে বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত কমিটির এ প্রধান দাবি করেন, ‘তবে মিলিটারি টেকওভার আমাদের দেশে সহজে কেউ করতে চাইবে না। কারণ পাকিস্তান, চীন ও বাংলাদেশ মিলে একটি ত্রিপক্ষীয় জোট ইতিমধ্যেই গঠন হয়েছে।’

তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার’-এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর সেই সম্ভাবনাটা আরও বেড়ে গেছে। আমার মনে হয় না ইরান সহজে ছেড়ে দেবে। যদি বিশ্ব একটি দীর্ঘযুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি বেশি হবে। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তো সমস্যা। আবার হুতিদের যা দেখলাম, তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলো হামলা করবে বলছে। এখন এটা যদি হয় তাহলে তো তেলের দাম বেড়ে যাবে। তেলের দাম বেড়ে গেলে তো প্রাইজ হাইক হবে সারা বিশ্বে। দুই নম্বর হলো যে, ইসরায়েল কিন্তু হেরে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যে ইসরায়েল কতদিন টিকবে, সেটা হলো একটা কথা। ওআইসিভুক্ত দেশগুলো তাদের কনফারেন্স করছে ইস্তাম্বুলে। এখন তারা কী পদক্ষেপ নেয় তাও বিবেচনায় আনতে হবে। তবে আমার ধারণা, এবার মুসলিম বিশ্ব বোধহয় এক হবে ইনশাআল্লাহ। এক হয়ে ইরানের পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলের বিপক্ষে দাঁড়াবে।”

এ যুদ্ধের শেষ পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রকে সুপার পাওয়ার থেকে সরে যেতে হতে পারে বলেও মনে করেন এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর এ যুদ্ধের বড় ধরনের প্রভাব হচ্ছে। এ যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, সেই প্রভাবটা দেশে পড়বে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপর একটা চাপ তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্য যদি আরও বেশি অশান্ত হয় তাহলে সেখানে আমাদের একটি বড় শ্রমবাজার আছে, সেখানে বিরূপ একটা চাপ পড়বে। তবে আমার মনে হয় না যে, আপাতত অর্থনৈতিকভাবে আমরা কোনো বড় ঝুঁকিতে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘যেটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে যে, সামরিক সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং পশ্চিমা বিশ্ব যদি এটার একটা বড় পক্ষ হিসেবে থাকে, তখন বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত একটা ঢিলেমি তৈরি হবে, যা উভয় সংকট সৃষ্টি করবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাংলাদেশে বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। তখন বাংলাদেশ চীনের দিকে যাবে না যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাবে নাকি নিজ মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ দেখবে— এ ধরনের কিছু কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে বাংলাদেশের জন্য। আর যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত বড় নয় কিন্তু তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে একটা বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে আক্রমণ প্রসঙ্গে এ অধ্যাপক আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে আক্রমণটা করেছে, এটাকে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো সরাসরি নিন্দা না জানালেও এটা পরিষ্কার যে, তারা জাতিসংঘের চার্টার, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র তারা নিজেদের মধ্যে যে আলোচনার কথা বলে আসছে— এ সবকিছুকেই লঙ্ঘন করে তারা এ কাজটি করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি এরকম একটি অসংগত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক সমাজে যে ভাবমূর্তি কিংবা তাদের যে জনমত; সেটার লস করবে।’

অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ধারণা একটি শান্তি প্রক্রিয়া কিংবা আলোচনা বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও চালু থাকবে, আবার আক্রমণের ঘটনাও ঘটতে পারে। আমরা নাটকীয় কোনো পরিবর্তন হয়তো এখানে দেখব না। কারণ ইরান হয়তো দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রকে টার্গেট করে আক্রমণের দিকে যাবে না। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের অত্যন্ত জনপ্রিয়, ভীষণ প্রভাবশালী জেনারেল ছিলেন কাশেমি। ওনাকে যখন হত্যা করে তখন ইরান যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তা খুবই বাস্তবসম্মতভাবে তার অবস্থা বিবেচনা করে করেছিল। বর্তমানে অনেকটা বিশ্ব জনমত ইরানের পক্ষে আছে, পাশাপাশি ইরান আরও চেষ্টা করবে এই যে যুক্তরাষ্ট্রের এ আক্রমণ আগ্রাসনের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে তাদের যে অবস্থান, তা নিন্দার মাধ্যমে ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করা। এর মধ্যে হয়তো চীন বা রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিশালী দেশ; ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাই যে, তুরস্ক তারাও কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অনেক বক্তব্য দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ইরানের নিজস্ব শক্তি এবং ভূরাজনৈতিক যে অবস্থান, এসব মিলিয়ে ইরানকে ইরাক কিংবা লিবিয়ার মতো চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের চিন্তা করে থাকলে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তারা খুব বড় ধরনের একটা ভুল করবে।’

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে এ অধ্যাপক আরও বলেন, ‘অনেকে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়েও বলেছে আবার এখনো বলছে। এটা আসলে অনেক দূরের ব্যাপার। বিশ্বযুদ্ধ না হলেও সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে একটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যে পড়তে পারে বিশ্ব। তখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে হলে এখানে রাশিয়া বা চীনকে যুক্ত হতে হবে ইরানের পক্ষে বা পশ্চিমা দেশগুলোর বিপক্ষে। এর সম্ভাবনাটা এখনো তেমন দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ইরান কতটা নিজেদের ধরে রাখতে পারে বা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজনমতকে কতটা উপেক্ষা করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারে। এগুলো পর্যবেক্ষণের ব্যাপার। ইরান তো পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেনি। এটা তো জাতিসংঘও বলছে, তাদের দেশেরই গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডও বলছেন। এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গভীর। যেহেতু ইসরায়েল আক্রমণ করেছে, সেই আক্রমণটাকে জাস্টিফাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করেছে।’

ড. দেলোয়ারের দাবি, ‘আমার যেটা মনে হয়, এ যুদ্ধের মাধ্যমে একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি হবে, আস্তে আস্তে হয়তো এটা একটা বড় যুদ্ধের দিকে যেতে পারে। যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ যুদ্ধ পুরোটাই কূটনীতিক তৎপরতা সফলতা-ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে। এখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এ যুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। বিশ্বকে স্তব্ধ ও অবাক করে দিয়ে বিশ্ব মোড়ল দেশটির হামলা এ যুদ্ধকে নানা দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত