জুনের শেষ তিনদিনে ঢাকায় প্রবাসীর হাট

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৫, ০৫:৪১ পিএম

দেশ রূপান্তরের ২৪ ডিসেম্বরের খেলার পাতায় শিরোনাম হয়েছিল "হামজা কি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা?" তখনও বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক হয়নি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা তারকার। মার্চে ভারতের বিপক্ষে অভিষেকের পর ঘরের মাঠে জুনের শুরুতে খেলেছেন আরও দুই ম্যাচ। ছয় মাস আগের সেই প্রতিবেদনের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে নিতে পারেন। হামজা সত্যিই হয়ে উঠেছেন এ দেশের ফুটবলের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তাকে লাল-সবুজে খেলতে দেখে অনেকেই আগ্রহী হয়েছেন। ঝাকে ঝাকে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে উড়ে আসছেন গ্যাটের পয়সা খরচ করে লাল-সবুজ জার্সির স্বপ্ন সত্যি করতে। হ্যাঁ, জুনের শেষ তিনদিনে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে বসবে প্রবাসী ফুটবলারদের হাট। ১৪ দেশ থেকে নানা বয়সী ৫২ ফুটবলার যোগ দেবেন ট্রায়ালে। সেখান থেকে প্রতিভা খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুসহ দেশের স্বনামধন্য কোচদের। এই ট্রায়াল দেখতে স্পেন থেকে উড়ে আসছেন জাতীয় দলের হেড কোচ হাভিয়ের কাবরেরাও। 

এত এত প্রবাসীর আগমনে অবশ্য আশার বেলুন ওড়ানোর সময় এখনও আসেনি। সত্যিকারেই এই ট্রায়াল দেশের ফুটবলের জন্য বড় সুখবর দিতে পারবে কীনা তা বলে দিবে সময়। তবে খোঁজ খবর নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। এই ৫২ জনের মধ্যে যেমন ১৪ বছরের কিশোর আছেন, আছেন ২৭ বছর বয়সী ফুটবলারও। অর্থাৎ এত বয়স হয়ে গেলেও প্রবাসে নিজের ফুটবল প্রতিভা সেভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি সেই ফুটবলার। তাই এই ট্রায়াল নিয়ে আছে অনেক অনেক প্রশ্ন। 

এ নিয়ে বুধবার রাজধানীর একটি কনভেনশলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। এ ট্রায়ালের নাম দেওয়া হয়েছে "বিএফএফ নেক্সট গ্লোবাল স্টার"। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, কানাডা, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, ওয়েলস, ইতালি, মালয়েশিয়া, এস্তোনিয়া, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় থাকা প্রবাসীরা ট্রায়ালে অংশ নেবেন। সবচেয়ে বেশি ২০ ফুটবলার আসছেন যুক্তরাজ্য থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ ফুটবলার নিবন্ধন করেছেন যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া সুইডেন থেকে ৫ ও কানাডা থেকে ২ জন ফুটবলার যোগ দেবেন ট্রায়াল। বাকি দেশগুলো থেকে আসছেন একজন করে। নানা বয়সী ফুটবলার আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেই দুই বয়স শ্রেণীতে ভাগ করে হবে ট্রায়াল। প্রথম দুই দিনে হবে দুটি করে সেশন। এরপর শেষ দিনে হবে বাছাইকৃতদের নিয়ে ম্যাচ। সেখান থেকে প্রতিভা খুঁজে নেবেন আলফাজ আহমেদ, মারুফুল হক, জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুসহ দেশের অভিজ্ঞ সব কোচরা। পাঁচ সদস্যের অভিজ্ঞ কোচিং প্যানেলের অবশ্য মূল দৃষ্টি থাকবে কমবয়সীদের দিকে। বাফুফে এই ট্রায়াল থেকে মূলত কমবয়সী কিশোরদের খুঁজে পেতে চাইছে যাতে বেশি সময় এদের কাছ থেকে সার্ভিস পাওয়া যায়। তাছাড়া আসন্ন কয়েকটি বয়সভিত্তিক আসরের জন্য তারা চাইবেন এই প্রবাসীদের মধ্য থেকে প্রতিভাবান বেঁছে নিতে। তেমনটাই জানালেন বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটু। তাছাড়া দেশের শীর্ষস্তরের ক্লাবগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে যাবে, যাতে ট্রায়ালে অংশ নেওয়াদের মধ্য থেকে কাউকে পছন্দ হলে তারা দলে নিতে পারে। 

ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ফুটবলাররা ব্যক্তিগত খরচে ঢাকায় আসছেন। বাফুফে কেবল তাদের প্রমাণ দেওয়ার মঞ্চটা প্রস্তুত করে দিচ্ছে। বাফুফের সহ সভাপতি ও ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এই ট্রায়াল প্রসঙ্গে বলেন, 'আমরা ফুটবলকে নানাভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ফেডারেশন থেকে কিছু স্ট্যান্ডিং কমিটি করা হয়েছে। এর বাইরেও কয়েকটা বিশেষায়িত কমিটি করা হয়েছে কর্মসূচীগুলো এগিয়ে নিতে। সেই ধরনের একটা কর্মসূচী হচ্ছে বিএফএফ নেক্সট গ্লোবাল স্টার। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি যারা আমাদের দেশের লিগে বা টুর্নোমেন্টে খেলতে চান তাদের আমরা উৎসাহিত করতে চাই। বাফুফে খুব সমস্যা না হলে কাউকেই ফিরিয়ে দিতে চায় না। যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তারা তো সহজে দেশমুখী হতে চান না। ফুটবলের মাধ্যমে অনেকেই দেশমুখী হতে চাইছেন। এটাকে সাধুবাদ জানানো আমাদের দায়িত্ব।'

প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ট্রায়ালের আয়োজন করলেও জাহেদির মূল দৃষ্টি স্থানীয় ফুটবল উন্নয়নে। ফুটবলে নতুন মুখ হয়েও এর মধ্যেই ডেভেলপেমন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার বিভিন্ন উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন অ্যাকাডেমিকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। জানালেন, 'কথা উঠেছে এতে কি আমরা স্থানীয়দের কম নজর দিচ্ছি। কথা সেটা না। আপনারা জানেন বাংলাদেশের ফুটবলের জাগরণের চেষ্টা করছি আমরা। আমাদের মূল ফোকাস তৃণমূলের ফুটবলকে সক্রিয় করা। তাই স্থানীয়দেরও মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে আমরা চাই কেবল প্রবাসীরা নন, বাংলাদেশ থেকেও এমন ফুটবলার খুঁজে বের করতে যারা গ্লোবাল প্লাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি যাতে করে আগামী কয়েক বছরে আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেলোয়াড় দেখতে পারি। অর্থাৎ এটা শুধু দেশের বাইরে থেকে দেশে আনতে চাই, দেশের ছেলেদেরও বাইরে দেখতে চাই।'

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী এই ট্রায়ালে অংশ নিলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এর বাইরেও অনেক বাংলাদেশ বংশদ্ভুত ফুটবলার গড়ে উঠছে উন্নত সব ফুটবল রাষ্ট্রের আধুনিক অ্যাকাডেমিতে। অনেকেই এভাবে ট্রায়াল দিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে নারাজ। তাই নিজ খরচায় ট্রায়াল দিতে আসাদের পাশাপাশি বাফুফের দৃষ্টি রাখা উচিত সেই ফুটবল প্রতিভাদের দিকেও। জাহেদী এখানেই ভীষণ আশাবাদী, 'দেখুন যারা, নিজ গুণে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, তাদের কিন্তু আমরা পয়সা খরচ করে হলেও নিয়ে আসছি। হামজা, শামিতদের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এরকম কেউ থাকলে অবশ্যই আমরা চেষ্টা করবো তাদের নিয়ে আসার।'

এই উদ্যোগে বড় ভূমিকা আছে ডেনমার্ক প্রবাসী এক কোচের। সাকিব মাহমুদ নামে এই তরুণ নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে বাফুফের যোগাযোগ করিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। জাহেদী সাকিবকে তাই জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা। পাশাপাশি এভাবে যদি আরও অনেকে এগিয়ে আসেন তাদেরও সাদরে গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত