গত ১৩ জুন ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে একযোগে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানোর মাধ্যমে নতুন মাত্রায় পৌঁছায় ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী সামরিক তৎপরতা। এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার এক দিন পর একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (এসিএলইডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত ইসরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানে মোট ৩৫ হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। এই হামলাগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবর্ষণ ও দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ—সবই ব্যবহৃত হয়েছে।
গাজা: লাগাতার ধ্বংসযজ্ঞ
সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে গাজায়—সংখ্যায় অন্তত ১৮ হাজার ২৩৫টি। ৬২৮ দিনেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ইসরায়েলের স্থল ও আকাশ হামলা চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৭৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ এই অভিযানের ধরণকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখল কৌশল
গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও ইসরায়েল তাদের কৌশলগত আগ্রাসন জোরদার করেছে। ইউএনআরডব্লিউএ একে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর সবচেয়ে বড় অভিযান বলে উল্লেখ করেছে। জেনিন, নুর শামস ও তুলকারেম শরণার্থী শিবিরগুলোয় স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ভবন ধ্বংস, সাঁজোয়া যান ও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুহারা হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ১ হাজারের বেশি, যাঁদের মধ্যে দুই শতাধিক শিশু।
সিরিয়ায় আক্রমণ: ক্ষমতার পতনের পর হামলা
২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আসাদ সরকারের পতনের ঠিক দুই দিন পর সিরিয়ায় বড় আকারের হামলা চালায় ইসরায়েল। দেশটির বিমানঘাঁটি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান ও কৌশলগত স্থাপনায় একের পর এক আঘাত হানে তারা। গত ছয় মাসে সিরিয়ায় চালানো হামলার সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।
লেবানন সীমান্তে ১৪ মাস ধরে সংঘাত
লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের সীমান্ত সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর। হিজবুল্লাহর সঙ্গে চলা এ সংঘাতে দুই পক্ষ মিলে অন্তত ১৩ হাজার ৬০০ বার আক্রমণ চালায়, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশই করেছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননের অনেক গ্রাম এবং বৈরুতের কিছু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইয়েমেন: হুতিদের লক্ষ্য করে হামলা
গাজা যুদ্ধ ঘিরে হুতিদের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জবাবে ইসরায়েল ইয়েমেনের হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হোদেইদা বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আক্রমণ চালিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসব হামলার মাত্রা বেড়ে যায়, যা ২০২৫ সালেও অব্যাহত রয়েছে।
ইরানে দূরপাল্লার অভিযান
১৩ জুন ইরানে চালানো সমন্বিত হামলা ইসরায়েলের আকাশসীমার বহির্ভূত সর্বোচ্চ সামরিক অভিযানের একটি দৃষ্টান্ত। প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন দিয়ে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোয় আঘাত হানে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আধুনিক হামলা সক্ষমতা
এফ-১৫, এফ-১৬ ও স্টেলথ প্রযুক্তির এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং উন্নত ড্রোন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অভিযানের বিস্তার সম্ভব হয়েছে। স্টেলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রাডারে ধরা পড়ে না, যা ইসরায়েলের আধুনিক বিমানবহরের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
মোটামুটি ২০ মাসের ব্যবধানে গাজা থেকে শুরু করে সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন এবং এখন ইরান—সব মিলিয়ে ইসরায়েল চারটি রাষ্ট্র ও একটি ভূখণ্ডে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশপথে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত অভিযান চালানো, এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই আঞ্চলিক সংঘাত ধীরে ধীরে বড় ধরনের যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে, যার পরিণতি হতে পারে আরও ভয়াবহ।
সূত্র: আল জাজিরা
ঢাকার বাতাস আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’
মোল্লাহাটে বিদেশি পিস্তল-গুলিসহ ১১ জন গ্রেপ্তার
মুশফিককে টপকে সবচেয়ে বেশি ডিসমিসালের রেকর্ড এখন লিটনের