হিলিতে প্রথমবারের মতো ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৫, ০৬:০৩ পিএম

দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে প্রথমবারের মত ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে নিরাপদ আম চাষ করেছেন নিরঞ্জন সরকার নামের এক কৃষক। আবহাওয়া ভালো থাকায় আমের ফলন ভালো হয়েছে। তেমনি ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লাভের আশা করছেন তিনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আম রপ্তানির আশা ওই কৃষকের। এদিকে নিরাপদ আম উৎপাদনে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে দাবি কৃষি বিভাগের।

প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) ও ক্লাস্টার ডেমোনস্ট্রেশন ফর গ্যাপ স্টান্ড্যার্ড অফ ফ্রুটস প্রকল্পের আওতায় হিলির গোহাড়া গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন সরকার এক একর জায়গায় বারী ৪ গৌরমতি ও আম্রপালি জাতের আম চাষ করেছেন। ইতোমধ্যেই বেশিরভাগ গাছের আম পরিপূর্ণ হয়েছে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাজারজাত করতে পারবেন বলে আশা তার।

বাগানে কর্মরত কর্মচারী নিপেন বর্মন বলেন, নিরঞ্জন দাদা এখানে আমের বাগান করেছেন। এই আম বাগানের পরিচর্যাসহ বাগানের সম্পূর্ণ দেখভাল করে থাকি। এখানে স্বাস্থ্য বিধি মেনে যেমন মুখে মাস্ক পড়ে ও গ্লাভস পড়ে কাজ করতে হয়। পানি দেওয়া থেকে শুরু করে ঔষধ প্রয়োগ বা ভিটামিন ছিটাতে হয়। যাতে করে উৎপাদিত আমে কোন জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে না পারে। বর্তমানে বাগানের চিত্র খুবই ভালো সবগুলো গাছেই আম আসছে, আকার বেশ ভালো হয়েছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ এই আম দেখতে আসছেন। এখানে কাজ করে যা আয় হয় তাই দিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসার ভালোভাবেই চলে যায়।

আগ্রহী কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, আমাদের গ্রামের পাশে নিরঞ্জন সরকার ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করেছেন। গাছে যেমন আম ধরেছে তেমনি আমের আকার বেশ সুন্দর। সেইসঙ্গে আম দেখতেও খুব সুন্দর হয়েছে, কোন ধরনের রোগবালাইয়ের আক্রমণ না থাকায়। এছাড়া এই পদ্ধতিতে আম চাষ নাকি লাভজনক আমের দাম ভালো পাওয়া যায়। সেইজন্য আমিও দেখতে আসলাম তার আমের বাগান দেখতে। আশা করছি আগামীতে আমিও এই পদ্ধতিতে আম চাষ করবো।

গোহাড়া গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন সরকার বলেন,গ্যাপ ও পার্টনার প্রকল্পের পক্ষ থেকে আমি প্রথমে ট্রেনিং করেছি এরপরে সেই প্রকল্পের আওতায় আমি এখানে আম চাষ করেছি। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমাদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয় সেই মোতাবেক আমের পরিচর্যা করে খুব উপকৃত হয়েছি আমরা। গৌড়মতি বারি ৪ আম্রপালি এসব প্রজাতির আম চাষাবাদ করেছি। এবারে আবহাওয়া ভালো থাকায় আমের ফলন বেশ ভালো লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাতে করে বাজার যদি ভালো পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে আম চাষাবাদ করে লাভজনক হবে বলে আশা করছি। এছাড়া যদি আমরা সরকারের পক্ষ থেকে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সুবিধা পায় তাহলে বিদেশে বাজারজাত করতে পারবো বলে আশা করছি। পূর্বে আমরা ব্যাগিং পদ্ধতি ছাড়াই আম চাষ করেছি সেক্ষেত্রে দাম খুব একটা ভালো না পাওয়ার কারণে খুব একটা লাভজনক হয়নি। এছাড়া ব্যাগিং পদ্ধতি ছাড়া আম চাষের ফলে অনেক ক্ষতিকারক পোকামাকড় আমের ওপর এসে বসে আমের ক্ষতি করে ফেলে। যার কারণে আমচাষিরা লাভের পরিবর্তে ক্ষতির সম্মুখীন হন বেশি। এছাড়া কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে যায়। যার কারণে আমরা মনে করি ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম পদ্ধতি। এছাড়া পোকামাকড় থেকে ফলকে মুক্ত রাখার সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বেশ উপকারী। কীটনাশক ব্যবহারের ফলে খরচ বেশি হয় ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করলে সেই খরচ থেকে বেঁচে যায়। এছাড়া একবার ব্যাগ ব্যবহার করলে সেই ব্যাগ দিয়ে পরের বছর ব্যবহার করা যায়। এতে করে এই পদ্ধতিতে আমের গুণাগুণ যেমন ভালো থাকে তেমনি খরচ কম হয় তাতে করে লাভজনক বলেই মনে হচ্ছে।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মত পার্টনার প্রকল্পের আওতায় গ্যাপ উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে আম চাষ প্রদর্শনী বাস্তবায়িত হচ্ছে। উপজেলার গোহাড়া এলাকায় কৃষক নিরঞ্জন রায় এক একর জায়গাতে আমবাগানের একটি প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। এই প্রদর্শনী বাগানে গ্যাপের যে প্রটোকল রয়েছে সেই প্রটোকল অনুসারে এই বাগানের সকল ধরনের পরিচর্যা বাগানের মাটি পরীক্ষা, পানি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বালাইনাশক স্প্রে কখন কোন বালাইনাশক স্প্রে করবে কি পরিমাণে করবে সবকিছু বিষয়ে তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে তার বাগান মনিটরিং করা হচ্ছে। ফল হারভেস্ট করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত যে পরিচর্যাগুলো না করলেই নয় সে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেফ ফ্রুটস হারভেস্ট বা প্রসেসের ক্ষেত্রে ব্যাগিং পদ্ধতি খুব জরুরি একটি পরিচর্যা গ্যাপ এর অন্যতম একটি প্রটোকল। যেখানে বালাইনাশকের পরিমিত ব্যবহার থেকে শুরু করে একটি ফলের সাইজ বা কালার সবকিছুই এই ব্যাগিং পদ্ধতির মাধ্যমে করা যায়। গ্যাপের অন্যতম লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে যেন এটি রপ্তানি করতে পারি। গ্যাপের সেই প্রটোকল মেনে আমরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকে শুরু করতে পারি। যেহেতু এই উপজেলায় সম্পূর্ণ নতুন তাই এটি যেন আরও ছড়িয়ে দিতে পারি সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এখানে যারা দর্শনার্থী আসেন বা যারা পরিচর্যার কাজ করেন তারা সকলেই কিন্তু গ্যাপ এর নীতিমালা অনুসরণ করে। যাতে করে এখানে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি না থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত