জগতে সম্পর্কের উষ্ণতা অনেক সময় নির্ভর করে যোগাযোগের গুণমানের ওপর। এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে রবি নিয়েছে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য রবি চালু করেছে একটি বিশেষ ভিডিও চ্যাট সার্ভিস, যার নাম সাইন কেয়ার।
এই সেবার মূল উদ্দেশ্য—কোনো কণ্ঠস্বর যেন অশ্রুত না থাকে, হোক তা মুখের ভাষা কিংবা সংকেত।
রবির নতুন এই সেবাটি প্রচলিত কাস্টমার সার্ভিস মডেল থেকে অনেকটাই ভিন্ন। সাইন কেয়ার একটি এজেন্টভিত্তিক ভিডিও সলিউশন। এতে রয়েছে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এজেন্ট। এমনকি সেবাদানকারীদের অনেকে নিজেরাও প্রতিবন্ধীদের (পিডব্লিউডি) একজন।
এই সেবায় সরাসরি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে যোগাযোগ করেন তারা। রবির ওয়েবসাইটে লগইন করে একটি বিশেষ সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বাটনের মাধ্যমে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী গ্রাহকরা একজন এজেন্টের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হতে পারেন। যিনি তাদের ভাষা ও বাস্তবতাকে সত্যিকার অর্থে বোঝেন। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত, শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং ক্ষমতায়নমূলক।
সাইন কেয়ারের মূল শক্তি হল একদল নিবেদিতপ্রাণ এজেন্ট। তাদেরই একজন মোবারক হোসেন, যিনি নিজেও শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী। কাজ করছেন রবির কাস্টমার সার্ভিস সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডে কাস্টমার সার্ভিস অফিসার (সিএসও) হিসেবে। মোবারক বলেন, "এই চাকরি শুধু আমাকে আর্থিক স্বাধীনতাই দেয়নি, এটি আমাকে সমাজে সম্মান অর্জনের সুযোগও দিয়েছে। আজ আমি শুধু একজন কর্মী নই, আমি আমার মতো অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণাও।"
আরেকজন সিএসও শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী আল-আমিন। কাজে যোগদানের প্রথম দিককার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথমে ভাবতাম পারবো কি না। কিন্তু রবি এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে আমি অন্য সবার মতোই দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারি। কাস্টমার সার্ভিস মানে গ্রাহকদের বোঝা এবং সাহায্য করা। আর আমি সেটাই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে পুরোপুরি করতে পারি।"
এজেন্ট টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন তানজিলা তারতুশি। তিনি সাইন কেয়ারের এক্সিকিউটিভ (অপারেশনস)। তার কাছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ কেবল একটি দক্ষতা নয়, বরং নিজের পরিচয়েরও অংশ।
তানজিলা বলেন, "আমার বোনের কাছ থেকে শিখেই আমি বড় হয়েছি। এখন আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে এই দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছি। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের একটি পথ।"
সাইন কেয়ার নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে রবির শ্রবণ প্রতিবন্ধী গ্রাহক আবু তালেব বলেন, "প্রথমবারের মতো আমি আমার নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছি এবং কোনো ভাষান্তরকারী ছাড়াই সব বোঝাতে পারছি। এটি আমার গোপনীয়তা ও মর্যাদাও রক্ষা করছে। আমিও যে সমাজের একজন স্বাধীন, সক্রিয় সদস্য তা অনুভব করতে পারছি এর মাধ্যমে।"
বিশেষ এই গ্রাহক শ্রেণিকে সেবা প্রদান প্রসঙ্গে রবির অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার-কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স মানিজা তাবাসসুম বলেন, "আমরা লক্ষ্য করেছি, ভিডিও কলই তাঁদের মূল যোগাযোগের মাধ্যম। তাই আমরা সবসময় চেষ্টা করি তাঁদের জন্য সেরা ডাটা প্যাকেজ ও সেবাটি দিতে। এমনকি সিম হারিয়ে যাওয়ার মতো জরুরি সমস্যাতেও আমরা সহানুভূতির সঙ্গে বিশেষ যত্ন নিয়ে সাহায্য করি।"
ঢাকার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটগুলো থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগ করে এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদেরকে দিয়ে তাদের মত অন্য মানুষদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে অনন্য এক সেবা মডেল গড়ে তুলেছে রবি।
এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য ভরসা, গর্ব, অন্তর্ভুক্তি ও আত্মসম্মানের সেতুবন্ধনও তৈরি হয়েছে। সাইন কেয়ার প্রমাণ করে যে, যে কোনো ভাষার যোগাযোগ কেবল একটি সুযোগ নয় -একটি অধিকারও।
