বৃক্ষ রোপণেই থাকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৫, ১২:৫১ এএম

পৃথিবীতে বৃক্ষের চেয়ে প্রকৃত বন্ধু জীবকুলে কেউ নেই। বৃক্ষ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় যে অক্সিজেন ত্যাগ করে, তা গ্রহণ করেই বেঁচে আছে পৃথিবীর প্রাণিকুল এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এ জন্য ‘বৃক্ষ’কে বলা হয় অক্সিজেন তৈরির  প্রাকৃতিক কারখানা। এই কারখানা সামান্য সময়ের জন্য বন্ধ হলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে মানবজাতি, পশুপাখি, বন্যপ্রাণীসহ জলাশয়ে বসবাসকারী মাছ, কুমির, শুশুকসহ জলজ প্রাণীর। বৃক্ষ কি শুধু অক্সিজেন সরবরাহ করে? না, বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। মাটির ক্ষয়রোধ করে। মাটির উর্বরতা সংরক্ষণে সহায়তা করে। কেঁচোসহ লাখ লাখ অণুজীবের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা হ্রাস করে। শীতল ছায়া প্রদান করে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। তালগাছ বজ্রপাতের হাত থেকে মানুষ ও গবাদি পশুর জীবন রক্ষা করে। গাছই মানুষ, পশুপাখির খাদ্য জোগায়। বন্যপ্রাণীদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। আদিমকালে মানুষ যখন আগুন জ¦ালাতে শেখেনি, তখন মানুষের প্রধান খাদ্য ছিল বন-জঙ্গলের ফলমূল।

শতভাগ মসলাবিহীন খাবার হলো ফল। এখানে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ রয়েছে, যা অন্য কোনো খাদ্যে পাওয়া যায় না। লেবুজাতীয় ফলে থাকে প্রচুর ভিটামিন-সি। ভিটামিন-সি দেহের ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করে। রক্ত জমাট বাঁধার কাজে সাহায্য করে। দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে  আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানবদেহের জন্য বিশেষ উপকারী। কাঁচা কাঁঠালের তরকারিকে বলা হয় গরিবের মাংস। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ থাকার কারণে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। জাম শরীরের হাড়কে মজবুত করে, ডায়রিয়া ও আলসার নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। আমড়া পিত্ত ও কফ নিবারক, রুচিবর্ধক এবং কোলেস্টেরেলের মাত্রা কমায়। সফেদায় প্রচুর ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে, যা হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখে। আমলকি সর্দি-কাশি সারাতে ও হজম ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। আমলকির রস কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর করে।  আমলকির রসের অ্যামিনো এসিড এবং প্রোটিন চুলপড়া রোধ করে। ফলের রাজা আমের গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আয়রন ও সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণে বেশ কার্যকরী এই ফল। এটি রক্তের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়। আমের ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করেছে, সুন্দরবনের বৃক্ষরাজি। প্রচণ্ড ঝড়ে বৃক্ষের ডালপালা ভেঙেছে। শেকড়সহ উপড়ে গেছে। তার পরও তারা রক্ষা করেছে উপকূল অঞ্চলের মানুষ এবং সুন্দর বনের প্রাণিকুল। সুন্দরবনই অন্যরকম ঢাল রচনা করে ঝড়ের তাণ্ডব থেকে রক্ষা করছে উপকূলের সাড়ে তিন কোটি মানুষ  এবং তাদের সহায়সম্পদ ও বাড়িঘর।

প্রত্যেক বসতবাড়ির আশপাশে উঁচু জায়গায় কমপক্ষে একটি ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের চারা লাগাতে হবে। প্রত্যেক বাড়ির আশপাশে কম করে হলেও একটি পেঁপে, ২/১টি আনাজি বা সাগর কলা, কমপক্ষে একটি লেবু এবং নলকূপের আশপাশে একাধিক আনাজি কচুর গাছ লাগানো উচিত। পেঁপে গাছ লাগানোর কারণ হলো পেঁপে তরকারি এবং ফল দুই হিসেবেই ব্যবহৃত  হয়। এর পুষ্টিগুণের তুলনা হয় না। এ জন্য বলা হয় প্রতিদিন পেঁপে খাও, বাড়ি থেকে বৈদ্য তাড়াও। কথাটি শতভাগ  সত্য। লিভার সিরোসিস রোগীদের কাঁচা পেঁপের তরকারি খাওয়ার পরমর্শ দেওয়া  হয়। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীদের পেঁপে খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা।  লেবুতে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি থাকে, তাই ভিটামিন সি-এর অভাব পূরণে লেবু রাখে অপূর্ব ভূমিকা। আনাজি কচুর গুণের কথা আর কী বলব? কচুশাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ থাকায় রাতকানা রোগ প্রতিরোধে এটি খুব উপকারী। সবাইকে পরিবেশ সুরক্ষার কথা চিন্তা করতে হবে। তবে ফসলি জমি কোনোক্রমেই নষ্ট করা যাবে না। যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না। গ্রামে বহু খালি জায়গা আছে। বিশেষ করে নদীর পাড়, যেসব এলাকায় ভাঙন হতে পারে, সেসব জায়গায় বড় শেকড়সমৃদ্ধ মাটি কামড়ে ধরে রাখার সক্ষমতাসম্পন্ন গাছ  লাগাতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেও গাছ লাগাতে হবে। দুর্যোগ প্রতিরোধে  গাছ আমাদের প্রথম সুরক্ষা দেয়। উপকূলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা, ম্যানগ্রোভ তৈরি করা, জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে বাঁচাতে ব্যাপকহারে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে।  বসতবাড়ির আশপাশের উঁচু জমি এবং বহুতল বিশিষ্ট ভবনের ছাদেও গাছ লাগাতে হবে। ছাদ বাগানের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। বছরে একবার শ্রেষ্ঠ ছাদ বাগানিদের পুরস্কৃত করা যেতে পারে।

একসময় এয়ারপোর্ট থেকে বাংলা একাডেমি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত  সড়কদ্বীপে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছে যখন ফুল ফুটত, তখন অপরূপ সাজ ছিল রাজধানী ঢাকার। আশার কথা এখন ঢাকাসহ সারা দেশে প্রচুর ছাদ বাগান হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়িও ঠাণ্ডা থাকছে, অন্যদিকে নিজের উৎপাদিত তরিতরকারি ও ফলমূল খাওয়ার আলাদা স্বাদও পাওয়া যাচ্ছে।  প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশের যে কোনো উন্নয়ন কর্মসূচি বা প্রকল্প পরিবেশের ক্ষতি করে পরিচালিত হয়, সেটি গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভবিষ্যতেও হবে না। তাই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে  পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে  টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। তিনি চান একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ যেখানে মানুষ থাকবে শান্তিতে এবং প্রকৃতি থাকবে সুস্থ। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যদি  পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয়, তা হলে সেটি সত্যিকারের উন্নয়ন নয়। আমরা তার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলতে চাই, পরিকল্পিত বৃক্ষ রোপণ ছাড়া সবুজ পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সম্ভব নয়। তাই আমাদের সবাইকে এই বর্ষা মৌসুমে কম করে হলেও একটি করে ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের চারা রোপণ করতে হবে এবং রোপিত গাছকে বড় করে তুলতে হবে। 

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত