মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

১৬ বছরেও হয়নি নতুন ভবন, ঝুঁকি নিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৫ পিএম

উপর থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, এর মাঝেই চলছে নেত্রকোনার মদনের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ২২৫ বর্গ কিলোমিটারের মদন উপজেলার প্রায় দুই লাখ হাওরবাসীর স্বাস্থ্যসেবায় ২০১৫ সালের পর হাসপাতালটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। নামে উন্নীত হলেও এক দশকেরও মেলেনি কোনো নতুন ভবন। জরাজীর্ণ অবস্থা আর পলেস্তারা খসের ঝুঁকিতে রোগীসহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৩১ শয্যার একটি ভবন। ফলে ১৯ শয্যার আরেকটি ভবনেই কোন রকমে চলছে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। 

হাওর বিস্তৃত এই উপজেলায় ১৯৭৫ সালে হাসপাতালটি চালু হলেও ২০২৩ সালে ৩১ শয্যার ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৫০ বছর পুরনো ভবনটির ভেতর-বাহির সব দিক থেকে খসে পড়ছে দেয়াল। দেয়াল খসে কারণে পুরো ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে আসবাপত্র। শুধু ভবনই হাসপাতালে ২৯ জন চিকিৎসকের স্থানে আছে মাত্র তিনজন চিকিৎসক। এছাড়াও লোকবল সংকটে বন্ধ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। 

স্থানীয়রা বলছেন, হাওরের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে দীর্ঘদিনেও মেলেনি সুচিকিৎসা সেবা। আশপাশের কয়েকটি উপজেলার রোগীরাও আসেন চিকিৎসা নিতে। শুধু প্রতিহিংসার কারণেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সেবায় অনেকটাই পিছিয়ে মনে করছেন স্থানীয়রা। 

মদন উপজেলা বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, আমরা হাওর এলাকার মানুষ। দীর্ঘদিনেও এই মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিগত সময় যারা রাজনীতি করেছে কোনো প্রকল্পের টাকা আসলে অর্ধেক তারা ভাগ করে নিয়ে গেছে। তাহলে প্রকল্প হবে কীভাবে আর উন্নয়ন হবে কীভাবে। আমরা চাই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা শিকার এই মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স টু দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নত একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা। 

স্থানীয় বিএনপি নেতা কর্মীরা বলছেন বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নিজ এলাকা হওয়ায় সবকিছু থেকেই পিছিয়ে ছিলো এই অঞ্চল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বিগত ১৬ বছর এই অঞ্চলকে পিছিয়ে রাখতে স্বাস্থ্য খাতসহ নানা ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগে। 

মদন উপজেলা বিএনপি সভাপতি নুরুল আলম তালুকদার জানান, মদন উপজেলার হাসপাতাল নামের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল আসে ১৯ শয্যা বিশিষ্ট কার্যক্রম চলমান। শেখ হাসিনার সরকারের অসহযোগিতার কারণে হাসপাতালে ভঙ্গুর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে চিকিৎসা সামগ্রী যন্ত্রপাতি প্রচুর থাকার কথা দুঃখের বিষয় মদনের হাসপাতালে কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। যেগুলো আছে অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। মাত্র তিনজন ডাক্তার কোনো রকমে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিশেষ করে এই ১৬ বছর অবহেলিত থাকার মূল কারণ হলো মদনের জনগণ ৯০ শতাংশ মানুষ বিএনপি করে। লুৎফুজ্জামান বাবরের অন্ধ ভক্ত। পূর্ববর্তী শেখ হাসিনা সরকার মদনের মানুষের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। সকল কিছুতেই শুধু হাসপাতাল নয় এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে মদনের মানুষ বঞ্চিত হয়নি। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মদনের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
 
মদন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল হুদা খান জানান, ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পরিদর্শন করে লিখিতভাবে পুরনো ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এই বিল্ডিংটি অনেক আগে ১৯৭৫ কিংবা তারও আগে। এটি মূল শয্যা অর্থাৎ ৩১ শয্যার একটি বিল্ডিং। তারপরও ৫০ শয্যার পুরো কাজটা আমাদের ১৯ শয্যার বিল্ডিং এ করতে হচ্ছে। এতে করে অতিরিক্ত চাপ নেয়ার ফলে স্বাভাবিক কাজেও বিঘ্ন ঘটছে। এ ভবন পরিত্যক্ত থাকার কারণে যে চিকিৎসকরা এখানে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তারাও নিরুৎসাহিত হন। পুনরায় চিকিৎসক আসতেও চান না। একই সংসদীয় আসনে দুটি উপজেলায় সুন্দর ও আধুনিক ভবন থাকলেও মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিছুটা ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিনের ওখানে উন্নয়ন না করায় হাসপাতালের খুবই করুণ অবস্থা। হাসপাতালের প্রতিটি সেক্টরেই ভঙ্গুর অবস্থা কেয়ারটেকারের অবস্থাও খুব করুণ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে গত ১৫-১৬ বছর হাসপাতালটি খুবই অবহেলিত ছিল। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। বারান্দায় রোগীদের জায়গা দিতে হয়। বিগত দুই বছর যাবত আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি হাসপাতালটিকে কার্যকর রাখার। তবে চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতা কর্মী প্রচুর জনবল রয়েছে। যার ফলে হাসপাতালে স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা দেখা দিচ্ছে। এই জনবল সংকট ও হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ জনিত সমস্যা দ্রুত নিরসন করা দরকার। 

নেত্রকোনা নির্বাহী প্রকৌশল অধিদপ্তর এ এফ এম আনিছুর রহমান জানান, মদন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ হয় ১৯৭৪ সালে। এমনিতেই এটার লাইফটাইম চলে গেছে। এটা পুনঃনির্মাণের জন্য আমরা দুইবার প্রস্তাব করেছি। এ প্রস্তাবনার মাধ্যমে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিলো। আমরা সেই প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিলাম কিন্তু সেটি পরবর্তীতে বাতিল হয়। এখন নতুন করে ডিপিপি মাধ্যমে হাসপাতালটি জরাজীর্ণ ভবন পুনঃনির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ডিপিপি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এটা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আছে। আমরা আছি আশা করছি ২৫-২৬ অর্থবছরে মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারবো।

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত