রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অধিকার ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘সপ্রান’ (সকল প্রাণের নিরাপত্তা), 'হেডশটের অ্যানাটমি: জুলাই বিদ্রোহের সময় রাষ্ট্র-স্পন্সরিত সহিংসতা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন' শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ বুধবার বিকেল ৪টায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আলোচনায় জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাষ্ট্র-সমর্থিতগোষ্ঠী দ্বারা আন্দোলনকারীদের মাথাকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে গুলি বর্ষণের দিকটি তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক প্রাণঘাতী অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচিন্তা কিভাবে এই ধরনের সহিংসতা ও বর্বরতাকে সম্ভব করে তোলে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করা হয়।
সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজের শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক, এবং আইন বিশেষজ্ঞরা। আলোচকদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও। আলোচনার শুরুতে সপ্রান-এর গবেষক নুসরাত জাহান নিসু প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে একটি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে আন্দোলন চলাকালীন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রয়োগকৃত হেডশট এর কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়।
সপ্রানের পক্ষ থেকে গবেষক জেবা সাজিদা সারাফ গবেষণাপত্রের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা সহিংসতাকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যেভাবে ভিন্নমত দমন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে তা তার গবেষণার সবার সামনে তুলে ধরেন এবং সপ্রান এর প্রস্তাবিত নীতিমালা গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে শহীদ মো. আতিকুর রহমানের ভাই মো. সোলাইমান তপু যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আন্দোলন চলাকালীন সময় পুলিশি নৃশংসতার বর্ণতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫৫ বছরের বৃদ্ধ সবাই প্রতিবাদী চেতনা নিয়ে মাঠে ছিলেন। তিনি সরকারের কাছে একজন শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন শহীদ মো. সাজিদুর রহমানের ভাই সিরাজুল ইসলাম। তিনি তার শহীদ ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, এখনও আম্মু ওমরের কথা চিন্তা করে কান্না করে। আম্মু চেয়েছিলেন ওমর যেন কখনো বড় না হয় - ও কিভাবে ছেড়ে গেলো আমাকে? তিনি হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত আইন শৃঙ্গখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিচারের দাবি জানান।
সভায় আলোচক হিসেবে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. বখতিয়ার আহমেদ বলেন, জুলাইয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক আমাদের সন্তানদের হত্যাযজ্ঞ দেখে আমি অনেক ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হলেও অবাক হইনি। কারণ গত ১৫ বছর ধরে তারা এর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, বন্দুক আসলে শাসকের মাদক। ঔপনিবেশিক সময়ের আইনগুলো এখনো সংবিধানে বিদ্যমান থাকার সমালোচনা করেন তিনি। বিগত সরকারের বিচার বহির্ভূত হত্যার একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের চোখের সামনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে একটা সরকার খুনী হয়ে উঠল, অথচ আমরা দেখেও কিছু করতে পারলাম না। তিনি দাবি জানান, পুলিশ আমাদের কখন কিভাবে কতটুকু দরকার, তা নতুন করে ভাবতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, রাষ্ট্র মাথাকে লক্ষ্য করে গুলি করার মাধ্যমে শুধুমাত্র ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করে না, বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যক্তির চিন্তাচেতনা ও আদর্শকে খুন করতে চায়। নেক্রপলিটিক্স ও শ্রেণি বৈষম্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরপরাধ মানুষের হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সরকার রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনারবিরোধী ইত্যাদি বিভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরি করত। তিনি জাতি হিসেবে সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বের আসার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাংবাদিক জিনা তাসরিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যেই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে, সেগুলোর আমদানির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক সাদমান রিজওয়ান অপূর্ব জুলাইতে এসকল হেডশটের আইনগত ও রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তার মতে, জুলাইয়ে আইনগত কোনও নীতিমালাই মানেনি আওয়ামী লীগ সরকার। জুলাইয়ে সংবিধানের লঙ্ঘন এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ও লঙ্ঘন হয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র তার জনগণকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে। পুলিশি নির্যাতনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশদের কথা শুনে মনে হতোনা তারা সরকারি চাকরিজীবী, মনে হতো তারা ছাত্রলীগের ক্যাডার। বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে একটি প্রশ্নত্তোর পর্বের আয়োজন করা হয়। সভায় সমাপনী বক্তব্য রাখেন সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমান। তিনি বলেন, শুধুমাত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন নথিভুক্ত করাই নয়, বরং রাষ্ট্র এই লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে কি কি ন্যারেটিভ ব্যবহার করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা, তা জনসম্মুখে উম্মোচন করার জন্য সপ্রান কাজ করে যাবে।
