চিকিৎসা চাইলে বাইরে যাও, হাতীবান্ধায় হাসপাতাল শুধু নামেই!

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ০৮:২৮ এএম

লালমনিরহাটের সীমান্তঘেঁষা হাতীবান্ধা উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র চরম অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসার ভার রয়েছে মাত্র চারজন চিকিৎসকের ওপর—যার মধ্যে একজন আবার দন্ত চিকিৎসক। অথচ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার পরিসর বাড়িয়ে ২০১১ সালেই একত্রিশ সজ্জা থেকে উন্নীত করা হয় পঞ্চাশ সজ্জায়। কিন্তু চিকিৎসাসেবা ও জনবল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক যুগেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই গাইনি বা শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে গর্ভবতী মায়েরা বা অসুস্থ শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ থাকলেও প্রচারের অভাবে অনেকেই তা জানেন না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের লম্বা সারি। বেশিরভাগ রোগীই সর্দি-জ্বর, ডায়রিয়া, গর্ভাবস্থা বা শিশুদের অসুস্থতা নিয়ে এসেছেন। এদের অনেকেই দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ—যাদের ভরসার একমাত্র স্থল এই হাসপাতাল।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। দন্ত চিকিৎসকের জন্য নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। ২৪টি নার্স পদের মধ্যে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৩ জন। বাকিরা ছুটিতে। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাও ব্যাহত হচ্ছে। নেই কোনো রেডিওগ্রাফার, ফলে এক্সরে মেশিন অকেজো পড়ে আছে। আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রপাতিও নেই। ওটি রুম থাকলেও অপারেশন করার মতো চিকিৎসক না থাকায় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

অপর্যাপ্ত ব্যবহারে এক্সরে ও অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতিগুলো প্রায় কোটি টাকা মূল্যের হলেও নষ্ট হওয়ার পথে। প্যাথলজিতে কিছু যন্ত্রপাতি থাকলেও পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা সম্ভব নয়, ফলে রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে বেশি অর্থ খরচ করে পরীক্ষা করাতে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শরিফুল আমিন বলেন, “হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়।” তিনি আরও বলেন, “প্যাথলজি বিভাগ আধুনিকায়নের জন্য যন্ত্রপাতির আবেদন করা হয়েছে। অল্প দিনের মধ্যেই তা পাওয়া যাবে। রেডিওগ্রাফার না থাকায় এক্সরে মেশিন চালানো যাচ্ছে না এবং অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।” তিনি স্বীকার করেন, লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে হাতীবান্ধার স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ নিয়ে তিনি নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আনোয়ারুল হক বলেন, “বর্তমানে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবার মান চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।”

হাতীবান্ধা উপজেলার অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র, কৃষিনির্ভর ও নিম্নআয়ের। তাদের একমাত্র চিকিৎসা ভরসার স্থান এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এলাকাবাসীর দাবি—অবিলম্বে এই হাসপাতালকে আধুনিক করে গড়ে তোলা হোক এবং সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক সাধারণ মানুষের জন্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত