ফেনীতে প্লাবিত শতাধিক গ্রাম জেলা জুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৫, ০৩:৫৬ এএম

ফেনীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের কারণে একের পর এক প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজানের পানিতে বছর না পেরোতে ফের বন্যার কবলে পড়েছে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১টি স্থান ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে ডুবছে জনপদ। প্লাবিত হয়েছে ১০৪টি গ্রাম। এতে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ।

এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলায় বন্যার পানি বাড়তে শুরু করেছে। ফুলগাজী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এদিকে পরশুরামের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ফেনী থেকে ফুলগাজী-পরশুরাম ও ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে গত বছরের মতো বন্যা হওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে এসব অঞ্চলের মানুষের মনে।

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলায় টানা চার দিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

শুক্রবারও জেলা জুড়ে হালকা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ছাগলনাইয়ার দক্ষিণ সতর এলাকার বাসিন্দা রবিউল হাসান বলেন, রাতেই পানি ঢুকতে শুরু করে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশ করে ঘরবাড়িসহ সবকিছু তলিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের বন্যায় এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে ক্ষমতা আর সরকারের পরিবর্তন হলেও আমাদের ভাগ্য কখনো পরিবর্তন হয় না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মুহুরী নদীর ১০টি, কহুয়া নদীর ৬টি ও সিলোনিয়া নদীর ৫টিসহ ২১টি অংশে ভাঙনে ফুলগাজীতে ৬৭টি, পরশুরামে ২৭টি ও ছাগলনাইয়ায় ১০টিসহ ১০৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বুধবার রাতে নতুন করে ফুলগাজীর আনন্দপুর, ছাগলনাইয়ার রেজুমিয়া, বেতাকা, সতের এলাকায় আটটি স্থানে বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়া গেছে। চার উপজেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়েছে।

ফেনী বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, প্লাবিত এলাকার অনেক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক মিটার ও সাবস্টেশন ডুবে যাওয়ায় নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ ব্যবস্থা চলতে পারে।

পরশুরাম পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. সোহেল আকতার বলেন, এ উপজেলায় ৩৩ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ৬০ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংযোগ দেওয়া হবে। তবে বিদ্যুতের বিভিন্ন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সহসাই সংযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুবল চাকমা বলেন, মাঠপর্যায়ে থেকে দুর্গত মানুষের সহায়তায় আমরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছি। উপজেলায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে ছাগলনাইয়ার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে।

ফেনীর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করছে। জেলার ছয় উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য সাড়ে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে কাজ করছেন।

জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফুলগাজী উপজেলায় ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে, যার মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩২টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৭টি। শুকনো খাবার বিতরণে প্রশাসন এর আগে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। জেলায় ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ১৩৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। যাদের মধ্যে ৯১৪ জন শিশু রয়েছে।

এদিকে গতকাল দুপুর ১টা থেকে বানভাসীদের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, বন্যার্ত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য স্পিডবোট নিয়ে আসা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বন্যাকবলিত পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

চৌদ্দগ্রামে জলাবদ্ধতায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত চার দিনের টানা ভারী বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি উপজেলার বেশ কিছু স্থানে মানুষের বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আঙিনা পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু যুগোপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। উপজেলার বাছাইকৃত স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে তৈরি করা ‘কুইক রেসপন্স টিম’, পৌর প্রশাসন, ইউপি সদস্যদের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে জলাবদ্ধতা নিরসনে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন।

টানা ভারী বৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে উপজেলার অনেক কৃষকের আমন বীজতলা। উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান মোল্লা বলেন, কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় আমার তিনটি আলাদা আমন বীজতলা এখন পানিতে নিমজ্জিত। এলাকার দুটি ব্রিকস ফিল্ডের কারণে এখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং শত শত কৃষকের আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি অফিসার ডুবে যাওয়া বীজতলা পরিদর্শন করেছেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে পানি নেমে না গেলে তা নষ্ট হয়ে যাবে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় ভারী বর্ষণের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে করে পানিবন্দি হয়েছে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ছোট মেরুং বাজার এলাকা, সোবহানপুর, চিটাগাংপাড়াসহ কয়েকটি গ্রাম এখনো ডুবে আছে। এদিকে সড়কের স্টিল ব্রিজ এলাকায় সড়ক তলিয়ে থাকায় রাঙ্গামাটির লংগদুর সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

খাগড়াছড়ি দীঘিনালার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র রায় বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছে। তবে আশ্রিতদের দরকার শুকনো খাবার, তাই তাদের রান্না করা খাবারের পাশাপাশি শুকনো খাবারও দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিশু ও বয়স্কদের জন্য মেডিকেল টিম রেডি আছে। পরিস্থিতি অবনতি হলে আরও ভালো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাগেরহাটে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা : বাগেরহাটে তিন দিনের বৃষ্টিতে শহরসহ নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় দেড় হাজার হেক্টর ফসলের মাঠ পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। গত তিন দিন জেলায় ৩০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে রাস্তাঘাট ও বাড়ির উঠান তলিয়ে রয়েছে। এতে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, গত তিন দিনে ৩০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে আউশ ধানের বীজতলা, পানের বরজ ও গ্রীষ্মকালীন সবজি মিলিয়ে ১৪২৪ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।

নোয়াখালীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ : তিন দিনের টানা বর্ষণ শেষে বুধবার সন্ধ্যা থেকে নোয়াখালীতে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কম থাকলেও গতকাল বেলা ১১টার পর থেকে আবারও শুরু হয়েছে বৃষ্টি। রাতভর কিছু এলাকায় পানি কমে গেলেও নতুন করে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে তা আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের। পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল নোয়াখালীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে প্রশাসন।

গোমতীর পানি বাড়ছেই : ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও কুমিল্লায় টানা বৃষ্টির কারণে গোমতী নদীর পানি বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোমতীর পানি বিপদসীমার ১ দশমিক ৬২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানির প্রবাহ বাড়ায় গোমতীর চরাঞ্চলের মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু জায়গা ও বাঁধের ওপর। স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে বাঁধ ভেঙে প্লাবনের আতঙ্ক।

পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১২টায় গোমতীতে পানির প্রবাহ ছিল ৯ দশমিক ৪২ মিটার। এরপর ছয় ঘণ্টায় তা বেড়ে ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। এখনো গোমতীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে, তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

২১ জেলায় তলিয়েছে ৭২,০৭৬ হেক্টর জমির ফসল : বন্যা ও বৃষ্টিতে দেশের ২১ জেলায় ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রাতে এ তথ্য জানায়।

মাঠতথ্য দিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি, পাবনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, শরীয়তপুর এই ২১ জেলার ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল প্রাথমিকভাবে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

এর মধ্যে আউশ ৪৪,৬৬২ হেক্টর, আমন বীজতলা ১৪,৩৯৩ হেক্টর, পাট ১৩৫ হেক্টর, শাকসবজি ৯,৬৭৩ হেক্টর, কলা ১১৪ হেক্টর, পেঁপে ২৯৩ হেক্টর, পান ৩৮৭ হেক্টর, বোনা আমন আবাদ ২৯৭ হেক্টর, মরিচ ১০৪ হেক্টর, পেঁপে ২৯৩ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ২৮১ হেক্টরসহ মোট ৭২,০৭৬ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল প্রাথমিকভাবে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত