গাছ আমাদের পরম উপকারী বন্ধু। এই জগতে গাছ ছাড়া এমন কোনো বন্ধু পাওয়া দুষ্কর হবে; যে নিঃস্বার্থভাবে বিপদে-আপদে আমাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। সেটা হোক আর্থিক, স্বাস্থ্য বা যেকোনো ক্ষেত্রে। কথাগুলো একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিলেন সেলিম হায়দার। তার উদ্দেশ্য একটাই একমাত্র নাতিকে গাছ বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তোলা।
মীরন আগ্রহী হয়ে বলল, দাদু, থামলে কেন? আমার তো ভালোই লাগছিল।
মৃদু হেসে সেলিম হায়দার বললেন, লক্ষ্মী দাদু আমার! তোমাকে শুধু পড়াশোনা করে বড় হলে চলবে না। একজন আদর্শ মানুষ হতে হবে।
: দাদু, আদর্শ মানুষ আবার কীভাবে হওয়া যায়?
: শোন জন্মিলেই মানুষ হওয়া যায়। কিন্তু আদর্শ মানুষ হতে হলে নিজের মধ্যে আদর্শের গুণাবলি চর্চা করতে হয়।
: আদর্শ গুণাবলি আবার কী, দাদু?
: আদর্শ গুণাবলি হলো এমন সব গুণাবলি যেখানে একজন মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। কখনো অন্য কারও ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো কাজ করে না। জীবনে চলার পথে সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
: ধন্যবাদ দাদু, এবার বুঝেছি। কিন্তু একটু আগে তুমি একটা কথা বলেছ, গাছ আমাদের পরম বন্ধু। গাছ আবার মানুষের বন্ধু হয় কীভাবে? ওরা কি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে?
নাতির কথা শুনে সেলিম হায়দার একটু ভেবে নিয়ে বললেন, আচ্ছা দাদু, তুমি না সেদিন বললে তোমাদের ক্লাসে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছে!
: জি। ও বোবা। কথা বলতে পারে না। কিন্তু খুবই মিশুক। ভালো ছাত্রও। ওকে সব স্যার-ম্যাডামরা পছন্দ করেন। আমরাও করি।
: কেন করো? ও তো তোমাদের মতো করে কথা বলতে পারে না। কথা বলতে না পারলে কি কেউ আমাদের বন্ধু হতে পারে?
: হ্যাঁ, অবশ্যই পারে। আমরা ওকে পড়াশোনার বিষয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করি। আবার সেও আমাদের প্রয়োজনে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করে। ওর বোবা বোবা কথাগুলো আমরা প্রথম প্রথম না বুঝলেও এখন ঠিকই বুঝতে পারি।
: তাহলে তোমার কথা শুনে বলতে পারি, বন্ধু হতে কথা বলতে পারাটাই মুখ্য না। পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব এবং ভালো লাগার বিষয়ই আসল।
: জি, দাদু। কিন্তু গাছ কীভাবে আমাদের বন্ধু হতে পারে? আমার মাথায় তা ঢুকছে না।
: আচ্ছা দাদু, তুমি বলো তো আমরা পরিবেশের বায়ুম-ল থেকে প্রতি শ্বাসে কী গ্রহণ করি?
: কেন? অক্সিজেন।
: সেই অক্সিজেন কোথা থেকে আসে তা বলতে পারো?
: হ্যাঁ, পারি। বায়ুমন্ডল থেকে।
: এবার বলো, বায়ুমন্ডল তা কোথা থেকে পেয়ে থাকে?
মীরন ডান হাতের তর্জনি মুখ ও নাক বরাবর লম্বালম্বি করে রেখে নাড়তে নাড়তে বলল, আমাদের সায়েন্স ক্লাসে জেনেছি, আমরা অক্সিজেন পাই বৃক্ষ থেকে।
: ভেরি গুড! তুমি ঠিকই জেনেছ। আরেকটা বিষয় কি জানো?
: কী বিষয়, দাদু?
: আমরাও কিন্তু তাদের সাহায্য করি। অক্সিজেন গ্রহণের পরই আমরা যে নিঃশ্বাস ছাড়ি তাতে থাকে কার্বন ডাই-
অক্সাইড। এই কার্বন ডাই-অক্সাইড আবার গাছের খাদ্য তৈরিতে কাজে লাগে। এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছ, আমরা একে অন্যের সহায়তাকারী। ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
: জি। আচ্ছা দাদু, তুমি আরেকটা কথা বললে, গাছের আর্থিকভাবে সাহায্যের কথা। এটা কী করে সম্ভব হতে পারে?
সেলিম হায়দার একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, শোন দাদু, তোমার মেজ ফুপুর বিয়ের সময় আমার হাতে তেমন টাকা ছিল না। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য অনেক টাকার দরকার ছিল। কার কাছে যাব? কী করব? তখন হঠাৎ মনে হলো, আমার নিজের হাতে রোপণ করা বড় বড় গাছগুলোর কথা। সাতটা গাছ বিক্রি করে যে টাকা পেলাম তা দিয়ে তোমার ফুপুর বিয়ে দিলাম।
আমাদের বাড়ির পেছনের অংশে এখন বড় বড় যে চৌদ্দটি গাছ দেখতে পাও সেগুলো তোমার ফুপুর বিয়ের ঠিক দুদিন আগে আমার হাতে রোপণ করা। আমি সবসময় মনে করি, প্রয়োজনে গাছ কাটলে কমপক্ষে তার দ্বিগুণ গাছ রোপণ করা উচিত।
মীরন আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, ম্যাজিক! চমৎকার ম্যাজিক!
: ম্যাজিক মানে?
: এটা তো ম্যাজিকের মতো ঘটেছে। তোমার দুঃসময়ে কাউকে যখন পেলে না তখনই গাছ তোমার বন্ধু হয়েছে।
সেলিম হায়দার এবার নাতিকে আদর করে বললেন, আরেকটা কথা বলি, তোমার বাবা যখন ক্লাস টুতে পড়ত তখন তার খুব সর্দিজনিত অসুখ হয়েছিল। কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। শেষে তুলসী গাছের পাতা খাওয়ালাম। চায়ের সঙ্গে ভিজিয়েও খাওয়ালাম। পাশাপাশি লেবুর শরবতও চলল। মাত্র ক’দিনেই সুস্থ্ হয়ে গেল। সেই থেকে আমার পাশাপাশি তোমার বাবাও বৃক্ষপ্রেমী হয়ে গেল।
মীরন খুশি হয়ে বলল, দাদু, আজ থেকে আমিও তোমাদের দলে যোগ দিলাম।
সেলিম হায়দার খুশি হয়ে বললেন, ধন্যবাদ, দাদু। একটি পরিবেশে পর্যাপ্ত গাছপালা থাকলে তা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে আমাদের বাঁচায়।
: সেটা আবার কেমন?
: এই যেমন ধরো, আমাদের পৃথিবীতে দিন দিন গাছপালা কমে যাচ্ছে। আমরা কারণে-অকারণে তা বিনষ্ট করছি। এতে করে ক্রমশ বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ছি। তুমি কি জানো আমাদের দেশের মানুষদের এসব দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে বাঁচতে কোন জিনিসটা সাহায্য করছে?
মীরন ওপরের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে নিয়ে বলল, না, দাদু, আমার মাথায় আসছে না। তবে সৃষ্টিকর্তার কথা বলতে পারি।
সেলিম হায়দার মীরনের মুখের দিকে সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু এখানে একটা কথা তোমাকে না বললে নয়। আমাদের দেশের বনাঞ্চল বিশেষ করে সুন্দরবন তার বুক পেতে দিয়ে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে।
মীরন আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল, ও মাই গড! গাছ তো সত্যি আমাদের পরম উপকারী নীরব বন্ধু!
