খুলনায় যুবদলের সাবেক নেতা মাহবুবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) মারামারির ঘটনাকে অধিক গুরুত্বসহ ৭টি কারণ সামনে রেখে তদন্ত নেমেছে পুলিশের তিনটি টিম। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলের আশপাশের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
এদিকে, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ডের পর একদিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে, পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, খুনিদের প্রায় শনাক্ত করা হয়েছে। এখন শুধু তাদের গ্রেপ্তারের অপেক্ষা।
অপরদিকে, হত্যাকাণ্ডে একদিন পর আজ শনিবার দুপুরে নিহত মাহবুবুর রহমানের পিতা মো. আব্দুল করিম মোল্লা বাদী হয়ে নগরীর দৌলতপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিহত মাহবুবুর রহমানের নগরীর মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা মাহবুবের শোকার্ত চাচা মো. শহীদ মোল্লা বলেন, ৫ আগস্টের আগে মাহবুবকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। মাহবুব সব সময়ই মাদক ব্যবসায়ী, চাদাঁবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলত। এ কারণে তার শত্রু বেড়ে যায়। তাকে প্রায়ই হুমকি দেওয়া হত। এলাকার ২-৩টি সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল। এক সপ্তাহ আগেও মাহবুবকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
মাহবুবের শ্বশুর আজাদ বেগ বাবু বলেন, বিএনপি অফিস ভাঙচুর মামলার বাদী হওয়া এবং ১ অক্টোবর নগরীর মাণিকতলায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় তার ওপর হুমকি ছিল। এ ছাড়া কুয়েটের মারামারির সময় যুবদলের নেতা হিসেবে মাহবুব ছাত্রদলের পাশে দাঁড়ায়। সে কারণে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল।
মাহবুবের চাচাতো ভাই আশরাফুল মোল্লা বলেন, রাজনীতি করার কারণে বিভিন্ন সময় অনেক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল মাহবুব। সে সব কারণে অনেকে তার শত্রু হয়ে ওঠে। সেই সব শত্রুতার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ৪ আগস্ট বিএল কলেজ রোডে বিএনপি অফিস ভাঙচুর ঘটনায় ২১ আগস্ট বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন মাহবুবুর রহমান। মামলায় ৫২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য মাহবুবুর রহমানকে প্রায় সময়ই হুমকি-ধামকি দেওয়া হতো।
এ ছাড়া গত ১ অক্টোবর সন্ধ্যায় মানিকতলা শহীদ মিনার চত্বরে ১নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি আয়োজিত সূধী সমাবেশে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হয়। পরের দিন ২ অক্টোবর বিএনপি নেতা জাকির হোসেন বাদী হয়ে ৪৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরো অজ্ঞাত ১০০-১৫০ জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলার পর মামলার বাদী জাকির ও মাহবুবকে হুমকি দেওয়া হতো।
অপরদিকে, এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২-৩টি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে মাহবুবের বিরোধ ছিল। এ ছাড়া মাদকের কেনাবেচা এবং চাঁদাবাজি নিয়ে একাধিক গ্রুপের টার্গেট ছিল মাহবুব।
সূত্র জানায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় অস্ত্র হাতে একটি ছবি ভাইরাল হওয়ার পর মাহবুবকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনার পর একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তার বিরোধের সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে মাহবুব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ রয়েছে ধুম্রজাল মধ্যে।
যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান হত্যার নেপথ্যে সাত কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কুয়েটের মারামারির ঘটনাকে অধিক গুরুত্বসহ ৭টি কারণ সামনে রেখে মাহবুবের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হচ্ছে। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, চরমপন্থীদের ও চরমপন্থিদের সঙ্গে কানেকশন।
পুলিশ সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের সময় মাহবুবের সঙ্গে গাড়ি পরিস্কারের জন্য অংশ নেওয়া ভ্যান চালককে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তার দেওয়া তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া শনিবার দুপুরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিহত মাহবুবের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর আতাহার আলী বলেন, মাহবুব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আমরা বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছি। তবে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, কুয়েটের মারামারির ঘটনাটি। এছাড়াও মাদক সংশ্লিষ্ট বিষয়টিওকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে আপাতত সে-গুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি টিম, দৌলতপুর থানা পুলিশের একটি টিম ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম কাজ করছে।
