গল্পটা খুব সম্ভবত লুইস সুয়ারেজের। আয়াক্স থেকে তখন সবে লিভারপুলে এসেছেন উরুগুয়ের এই ফরোয়ার্ড। সেই জানুয়ারিতেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ জিতেছে ইংল্যান্ড। কারও কাছে বোধহয় জানতে চেয়েছিলেন ক্রিকেট খেলাটা সম্পর্কে, যখন জানলেন ৫ দিন খেলেও হারজিতের নিষ্পত্তি হয় না তখন নাকি বলেছিলেন, ‘আমি যদি বাড়িতে বলি যে ৫ দিনের জন্য খেলতে যাচ্ছি তাহলে আমার বউ এটা জীবনেও বিশ্বাস করবে না’। রিলস আর টিকটকের এই সময়ে যখন মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব ১০ সেকেন্ডের কম সেখানে ৫ দিন ধরে চলমান একটা খেলা, যেটা অনেক সময়ই অমীমাংসিতভাবে শেষ হয় সেটা এখনো প্রচলিত আছে- সেটাই বিস্ময়কর। গ্রামোফোন, টেলিগ্রাম কিংবা ফিল্ম ক্যামেরার মতো টেস্ট ক্রিকেটও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারত, কারণ মোবাইলেই সব কিছু পেয়ে যাওয়ার মতো করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটও তো তার সর্বগ্রাসী শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে খেলাটির একক চেহারা হতে, তখনো টেস্ট ক্রিকেট টিকে আছে। বিলুপ্তপ্রায় তুষার চিতার মতো মাঝে মাঝেই জানান দিচ্ছে, প্রায় দেড়শ বছর বয়স হলেও টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে আছে স্বমহিমায়।
ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে ইংল্যান্ড-ভারত টেস্ট সিরিজের তৃতীয় টেস্টের সমাপ্তির দৃশ্যটা দেখুন। বেন স্টোকস সান্ত¡না দিচ্ছেন মোহাম্মদ সিরাজকে। আমির বশিরের নিরীহ বলটাকে ভালোভাবেই সামলেছিলেন, সেই বল গড়িয়ে গিয়ে স্টাম্পে লেগে বেল ফেলে দিল! অথচ তার আগে কী ধৈর্যের লড়াইটাই না লড়ছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা। এক অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াইতে প্রায় জিতেই গিয়েছিলেন, যে লড়াইয়ের তীব্রতা কতখানি সেটা স্টোকসই সবচেয়ে ভালো জানেন। লর্ডসেই সিরাজের বলে দুই পায়ের মাঝে আঘাত পেয়ে মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়েছিলেন স্টোকস। আউট হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে মাঠে হাঁটু ভেঙে বসে পড়া সিরাজকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসা প্রথম মানুষটা সেই স্টোকসই।
লর্ডসে রবীন্দ্র জাদেজা যখন ব্যাট করছিলেন, তখন তার সঙ্গে জীবনের মিল খুঁজে পেতে পারেন সীমিত আয়ে মাস চালানো কোনো দরিদ্র চাকরিজীবী। মাসের শেষ কটা দিন যেমন ড্রয়ারের কোনায় পড়ে থাকা খুচরো সিকি আধুলিকেও মনে হয় আকবরি মোহর, জাসপ্রিত বুমরাহ আর সিরাজকে নিয়ে সেভাবেই ওভারে এক রান এক রান করে নিয়ে জয়ের লক্ষ্যের দিকে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন জাদেজা। ২৬৬ মিনিট, ১৮১টা বল সামলে ফেলেছিলেন; নীতিশ রেড্ডি, বুমরাহ আর সিরাজকে নিয়ে ৮৮ রান তো জুড়েই দিয়েছিলেন জাদেজা। আর ২২টা রান করে ফেললেই লর্ডস টেস্টে ভারত জিতে যায়, সিরিজটা ২-১ হয়ে যায় আর জাদেজা ভারতের ক্রিকেট রূপকথায় স্থায়ী জায়গা করে নেন। কিন্তু সেটা আর হয় না। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনটা ট্রিপল সেঞ্চুরি করেও ‘বিটস অ্যান্ড পিসেস’ ক্রিকেটার রয়ে যাওয়া জাদেজা, মহেন্দ্র সিং ধোনির বিশেষ স্নেহধন্য বলে যার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক রসিকতা ছড়িয়ে আছে, সেই জাদেজার জাতে ওঠা হয় না। যেমনটা পারেননি ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২ দিনে গড়ানো সেই ওয়ানডেতে যখন খসে গেছে ভারতের গজদন্ত মিনারের মতো টপ অর্ডার, রাহুল-রোহিত-বিরাটদের নামের পাশে স্রেফ ১-১-১ সেদিন জাদেজা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ৭৭ রানের ইনিংসটাকে আরেকটু বড় করতে পারলে, ধোনিকে আরেকটু সঙ্গ দিলেই হয়তো ভারত ফাইনালে চলে যেত, ১৮ রানের ঘাটতিটা থাকত না। কিন্তু জীবনের মতো টেস্ট ম্যাচেও সব সময় সব কিছু সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো শুভ সমাপ্তি হয় না। যে বলটায় উইকেটপ্রাপ্তির সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি, সে রকম এক ডেলিভারিতেই বোল্ড হয়ে যান সিরাজ। অফস্টাম্পের বাইরের বল, ব্যাটসম্যান ডিফেন্স করার পর মাটিতে পড়ে গড়িয়ে গিয়ে স্টাম্পে লাগে। অনপ্রান্তে দাঁড়ানো জাদেজা কী বলবেন এই ঘটনাকে? ভাগ্য নাকি কর্মফল।
লর্ডসে নাটকীয় সমাপ্তির রেশ কাটতে না কাটতেই জ্যামাইকায় গোলাপি বলে মিচেল স্টার্কের ধ্বংসযজ্ঞ। গোলাপি রঙ মানেই নারীত্ব, কোমল, কমনীয়। তবে জ্যামাইকায় স্টার্কের হাতের গোলাপি বল হয়ে উঠল ধ্বংসের প্রতীক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে, স্টার্কের করা প্রথম ওভারটা ছিল পেস বোলিংয়ের শৌর্যের প্রদর্শনী। পাটা উইকেট, উচ্চপ্রযুক্তির ব্যাট আর নানান নিয়মকানুনের শেকলে ক্রিকেটকে রানপ্রসবা করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় কোপটা পড়েছে পেসারদের ওপর। পড়ে পড়ে মার খাওয়াই যেন তাদের নিয়তি। ফ্র্যাঙ্ক ওরেল সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়া, দুই দলের পেসাররাই ধারণ করেছেন অগ্নিমূর্তি। বাতাস, গোলাপি বলের সুইং, দিন-রাতের আলোর বিভ্রমÑ সব কিছুই কাজ করেছে প্রভাবক হিসেবে; তবে সব কিছুর পরও জ্যামাইকা টেস্টে বহুদিন পর দেখা মিলেছে সেই পুরনো দিনের মতো নির্মম পেস বোলিংয়ের। স্টাম্প ভাঙার আওয়াজ, বলের আঘাতে বাতাসে পাক খেতে থাকা স্টাম্প, পেসারের বুনো উল্লাস...ক্রিকেটের আদিমতম সৌন্দর্য আবারও দেখা দিল স্বমহিমায়। যে দৃশ্যটা দেখা গেছে লর্ডসেও, জোফ্রা আর্চারের একটা স্পেল গুঁড়িয়ে দিয়েছিল দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের মিডল অর্ডার।
টেস্ট ক্রিকেট মানেই গলে বাংলাদেশের স্বার্থপর ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী নয়, ইনিংসে ৫ উইকেট প্রাপ্তি তাইজুল ইসলামের মতো ১৩১ রান দিয়ে দয়াদাক্ষিণ্যে পাওয়া কিছু উইকেট ঝুলিতে ভরা নয়। টেস্ট ক্রিকেটের শ্বেতশুভ্র গৌরবে এসব কালিমা শেষ পর্যন্ত লেগে থাকে না, ঢেকে যায় চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল সব আখ্যানে। তাই তো দেড়শ বছরেও টেস্টের আবেদন ফুরোয় না। টি-টেন আর টিকটকের যুগের টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে আছে স্বমহিমায়, স্বকীয় সৌন্দর্যে।
'চ্যাম্পিয়নস লিগের চেয়ে বড় হবে ক্লাব বিশ্বকাপ'
দুই মাঠে খেলে ভুটানের জালে 'এক হালি' মেয়েদের