দামেস্কে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলা

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ০৮:৫০ এএম

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্ট ভবন ও সামরিক সদরদপ্তরের নিকটবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও অন্তত ৩৪ জন আহত হয়েছেন। খবর: আল-জাজিরা

একই দিন দক্ষিণ সিরিয়ার সুয়েইদা শহরেও বিস্ফোরক হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ওই অঞ্চলে চার দিন ধরে দুর্জ সশস্ত্র দল, বেদুইন গোত্র ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছিল, যাতে শতাধিক প্রাণহানি ঘটে। দীর্ঘ সংঘর্ষের পর এক শান্তিচুক্তি কার্যকর হলেও, পরিস্থিতি থেমে নেই।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দামেস্ক ও সুয়েইদায় ইসরায়েলি হামলা পূর্বপরিকল্পিত এবং দেশটির নিরাপত্তা ধ্বংস ও অস্থিরতা উসকে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত। তারা এ হামলাকে সিরিয়ায় অরাজকতা ছড়ানোর ধারাবাহিক ইসরায়েলি নীতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরায়েল হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে বলছে, তারা সুয়েইদায় দুর্জ সম্প্রদায়কে রক্ষার উদ্দেশ্যে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরীয় বাহিনীকে ওই এলাকা থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক্সে বলেন, ‘দুর্জদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের পুরোপুরি সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল সুয়েইদায় অভিযান চালিয়ে যাবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, বুধবার সংঘর্ষে জড়িত সব পক্ষ একটি নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তিতে উপনীত হয়েছে, যা এই ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসান ঘটাবে।’ তবে তার আগের দিন একটি অনুরূপ সমঝোতা ভেঙে পড়েছিল। রুবিও বলেন, ‘সব পক্ষকে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে—আমরা সেটাই প্রত্যাশা করছি।’

সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল পর্যন্ত সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০০ জন, যাদের মধ্যে রয়েছেন ৪ শিশু, ৮ নারী এবং ১৬৫ জন সেনা ও নিরাপত্তাকর্মী।

সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্জ নেতা শেখ ইউসুফ জারবু জানান, তারা একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। কিন্তু দুর্জদের আরেক নেতা শেখ হিকমত আল-হাজারি এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেন, “সুয়েইদা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।”

সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় ‘অবৈধ গোষ্ঠী’ নির্মূল শেষে সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে সুয়েইদা থেকে প্রত্যাহার শুরু করেছে।

সুয়েইদায় দুর্জ ও বেদুইনদের মধ্যে পারস্পরিক অপহরণ এবং সহিংসতার মধ্য দিয়েই এই সংঘাতের সূচনা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে সরকারি বাহিনী দুর্জদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, যা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ও ‘অপরাধমূলক কাজ’ হিসেবে স্বীকার করেছে।

এই অবস্থাকে ইসরায়েল নিজেদের হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চ্যাথাম হাউসের পরামর্শক হায়েদ হায়েদ জানান, ‘গত বছর বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকেই ইসরায়েল চায় না সিরীয় সেনারা দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থান করুক।’

তার ভাষায়, ‘ইসরায়েল এখন নিজেদের দুর্জ সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করছে।’

ওমরান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আম্মার কাহফ বলেন, ‘ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে, তারা সিরীয় সরকারের দেশজুড়ে কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মেনে নেবে না।’

এদিকে আল-জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি জেইনা খোদর জানান, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে সরকার শহরে চেকপোস্ট স্থাপনসহ সীমিত উপস্থিতি বজায় রাখবে। তার মতে, ‘সরকার যদি পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করে, তাহলে দেশের ঐক্য পুনর্গঠনের যে প্রচেষ্টা চলছে, তা ব্যর্থ হবে। আর সেনা রাখা হলে ইসরায়েলের সঙ্গে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা থেকে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত