জুলাই সনদ

১১ মাসেও ঐকমত্য হয়নি, ঝুলে আছে মৌলিক সংস্কার

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৫, ০১:০০ এএম

দেশে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়া এখনো কাঙ্খিত ফলাফল আসেনি। ‘জুলাই সনদ’ নামে প্রতীক্ষিত জাতীয় রূপরেখা প্রকাশের কথা থাকলেও এক মাসের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি না হওয়ায় সংশয় দেখা দিয়েছে পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একের পর এক সংলাপ ও বৈঠকে নানা বিষয়ের উপর আলোচনা হলেও মূল সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বেশিরভাগেই এখনো রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের উপর চাপালেও, সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও।

আলোচনার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে একটি ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছে কমিশন। তবে কমিশনের তৈরি করা স্প্রেডশিটে অন্তর্ভুক্ত ১৬৬টি মৌলিক প্রস্তাবের কতগুলো বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে, কিংবা আদৌ সুরাহা পাচ্ছে কি না, অথবা জুলাই সনদও কি ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তৈরি হবে কি না- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টানা একমাসেরও বেশি ধরে ১৪ টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠক সকাল থেকে বিকেল অবধি অনুষ্ঠিত হয়।

এসব বৈঠকে বড় ইস্যুগুলোর মধ্যে  জরুরি অবস্থা ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগেই দলগুলোর মধ্যে  ঐকমত্য হয়। একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফেরার বিষয়ে দলগুলো একমত জানালেও এর কাঠামো ও পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য আসেনি। বিশেষ করে এ সরকারে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে আলাদা আলাদা প্রস্তাব দিয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে এ পর্যন্ত যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, তা হলো:সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, প্রধান বিচারপতির নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের জন্য আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন ও উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত গঠন।

নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে- ১. সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত কমিটি (যা আগে ‘জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল বা এনসিসি নামে প্রস্তাবিত ছিল) ২.দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের কাঠামো, বিশেষত উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য মনোনয়ন ও নির্বাচনের পদ্ধতি এবং এখতিয়ার।৩. নারীদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ও সরাসরি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়নি। ৪. প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ধরন পরোক্ষ না সরাসরি নির্বাচন—এ নিয়ে ভিন্নমত।

৫. রাষ্ট্রের মূলনীতি পুনর্বিন্যাস : ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধ।

৬. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল নির্ধারণ: কয়েকবার টার্ম নির্ধারণ হবে কি না, এ নিয়ে দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন।

৭. তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের রূপরেখা। নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে মতৈক্য হয়নি।৮. বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা : বিচার বিভাগ স্বাধীনতা ও প্রেসিডেন্টের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণে জটিলতা। ৯. নাগরিক অধিকারের সম্প্রসারণ

মৌলিক অধিকারে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দলগুলোর মতবিরোধ।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি অনড় অবস্থানে থাকলেও, অন্য অনেক দল এখনও এই পদ্ধতির বিরোধিতা করছে। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়েও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশন জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব করেছিল। তবে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এনসিসির প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে সংস্কার কমিশনের দেওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রূপরেখার সুপারিশও বাদ হয়ে যায়।

এদিকে জুলাই সনদ ঘোষণার বিষয়ে সরকার ও কমিশনের পক্ষ থেকে বার বারই ৩১ জুলাই নির্ধারণ করা হয়েছে। ড. আলী রীয়াজও সম্প্রতিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় বিভিন্ন সময়ে বলে আসছিলেন, “৩০ অথবা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যেকোনোভাবে একটি সনদ তৈরি করতেই হবে। ব্যর্থতা হলে সেটি আমাদের সবার। কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়েই আমাদের ঐক্যে পৌঁছাতে হবে।”

এরইমধ্যে রাজনৈতিক পক্ষগুলো সময়মতো জুলাই সনদ ঘোষণা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ঐকমত্য হলেই চূড়ান্ত রূপারেখা পাওয়া যাবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন,  এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য দরকার। অভ্যুত্থানেরেএক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।  অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঐক্য প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, সব দলের ঐক্য ছাড়া সংকট ও ষড়যন্ত্র থেকে বের হয়ে আসা যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, কমিশনের বৈঠকে তো রাজনৈতিক দলগুলো একেক কথা বলে। ফলে সংস্কার হবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত