যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ শুরুর আগের নিয়মিত দৃশ্য হচ্ছে খেলা মাঠে গড়ানোর দিন সাতেক আগে থেকেই মিরপুরের শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন। খেলোয়াড়রা আসেন ব্যক্তিগত অনুশীলনে, এরপর দলগত অনুশীলন শুরু হয় কোচদের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ, যেটা আদতে এই বছরে মিরপুরে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ, তার আগে স্টেডিয়ামে নেই বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার! বরং শুক্রবার প্রথমবারের মতো অনুশীলন করল পাকিস্তান দল।
আদতে শ্রীলঙ্কা সফর শেষে বৃহস্পতিবারেই দেশে ফেরা বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা শুক্রবারটা কাটিয়েছেন বিশ্রামে। আনুষ্ঠানিক সফরসূচিতে লেখা ছিল বিশ্রাম/ অনুশীলন। কেবলমাত্র নাঈম শেখ বাদে বাকি সবাই বিশ্রামে, আর জাকের আলী অনিক এসেছিলেন জিমনেশিয়াম। সন্ধ্যায় আসে পাকিস্তান দল। বুধবার বাংলাদেশে পা রাখার পর বৃহস্পতিবার বিশ্রাম নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় ফ্লাডলাইটের আলোয় অনুশীলন করতে চলে আসেন সালমান আগার নেতৃত্বে বাংলাদেশে খেলতে আসা ক্রিকেটাররা। কমবেশি এই দলটাই মে-জুনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩টি টি-টোয়েন্টির সিরিজে খেলেছিল এবং সিরিজের ফল ছিল পাকিস্তান ৩-০ বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের মাটিতে ফলটা এমন একপেশে হবে না, এমন দাবি ক্রিকেটাররা করতেই পারেন আজকের সিরিজপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে। সে সময়টায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের উত্তাপ এবং উত্তেজনার সঙ্গে আরব আমিরাতের কাছে সিরিজ হারের লজ্জাও খেলার মাঠে ছিল সঙ্গী। এবারে দেশের মাটিতে চিরচেনা মাঠে খেলার সুবিধা, স্থানীয় দর্শকদের সমর্থন আর শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি স্নায়ুকে শান্ত রাখতে পারে। তবে আকাশ থেকে খসে পড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে কাল হয়ে উঠতে পারে শ্রাবণের বৃষ্টি। শুক্রবার সন্ধ্যায় মিরপুরের আকাশ মেঘমুক্ত, পাকিস্তান যখন অনুশীলনে তবে খানিকটা দূরেই উত্তরা আর গাজীপুরে চলছিল ধুম বৃষ্টি। বছর চারেক আগে, এমনই এক ভরা বর্ষায় আর করোনা মহামারীর সময়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। মেঘলা আবহাওয়ায় তখন সূর্যের দেখা পাওয়া ভার, উইকেট রাখতে হচ্ছিল ঢেকে। বাংলাদেশ ৪-১ ব্যবধানে সিরিজটা জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যাটসম্যানদের মনোবল ভেঙে হয়েছিল চূর্ণ-বিচূর্ণ। ৫ ম্যাচের ১০ ইনিংসে একদম প্রথম ম্যাচের প্রথম ইনিংসে হয়েছিল ১৩১ রান, সেটাই সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন ইনিংস ছিল ৬২ রানের। পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজটায় নিশ্চয়ই এমন কিছু চান না বিসিবির কর্তাব্যক্তিরা, কারণ মিথ্যে সাফল্যের বেলুনের পরিণতিটাও তো তাদের জানাই আছে। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীন ফাহিম, মিডিয়া কমিটির প্রধান ইফতেখার আহমেদ মিঠুর সঙ্গে শেষ বিকেলের আলোয় বেশ কিছুক্ষণ আলাপ করলেন বিসিবির প্রধান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভা। মাঠে তখন অনুশীলনে পাকিস্তান দল। গা গরম আর ক্যাচিং অনুশীলন শেষে সেন্টার উইকেটে স্থাপন করা নেটে ব্যাটিং অনুশীলন করছিলেন ফখর জামান-সাইম আইয়ুবরা। বড় বড় শট খেলছিলেন পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা, লম্বা লম্বা ছক্কায় প্রায়ই বল আছড়ে ফেলছিলেন সীমানা দড়ির ওপারে।
দুপুরে একা একাই অনুশীলন করলেন নাঈম শেখ। প্রায় বছর তিনেক পর টি-টোয়েন্টি জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। কিন্তু পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে তাকে ব্যাট করতে হয়েছিল চারে, ফেরার ম্যাচে ২৯ বলে ৩২ রানের ইনিংস খেলে বাহবা পাওয়ার বলে সমালোচিতই হয়েছিলেন নাঈম। আত্মপক্ষ সমর্থনে নাঈম বললেন, খেলার প্রস্তুতিই নাকি ছিল না তার, ‘সত্যি বলতে, জাকের ইনজুরিতে ছিল বলেই আমাকে চারে ব্যাট করতে হয়েছে। আমার পাঁচে খেলার কথা ছিল।
তো ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেই নামতে হয়েছে। সাধারণত আমার খেলারই কথা ছিল না। যদি আগে জানতাম এমন সুযোগ আসবে, তাহলে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতাম।’ যদিও স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার পর থেকেই একজন ক্রিকেটারের মানসিকভাবে তৈরি থাকাটাই দস্তুর আর ম্যাচের নবম ওভারে ব্যাট করতে নামা নাঈমের প্রস্তুতির জন্য আর কতটা সময় দরকার ছিল সেটাও থেকে গেছে অজানা। তবে নাঈম বলছেন আগামীতে তৈরি থাকবেন, ‘মিডল অর্ডারে হঠাৎ নেমে খেলা সহজ নয়। ওপেনিংয়ে যেভাবে খেলি, সেটি একেবারেই আলাদা। অভিজ্ঞতা হিসেবে ভালো ছিল। এখন চেষ্টা করব এমন পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত থাকতে।’ অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রচুর রান করেও জাস্টিন ল্যাঙ্গার-ম্যাথু হেইডেন জুটির কারণে সুযোগ পাচ্ছিলেন না মাইক হাসি, জাতীয় দলে খেলার জন্য তিনি নিজেকে মিডল অর্ডারে নামিয়ে আনেন। ৩ বছর পর জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া নাঈম যেভাবে সেটা অপচয় করলেন এবং অজুহাত দিলেন, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নির্বাচকদের সংকটটা। নাঈম হয়তো বুঝে গেছেন, ঘুরে ফিরে আবারও ডাক আসবে।
সবাই যেদিন বিশ্রামে, সেদিন অনুশীলন করার বাহবাটা পেতেই পারেন নাঈম। যদিও তিন বছর পর দলে ফিরে এক ম্যাচের বেশি খেলা হয়নি তার, তবে সিরিজ জয়ের দলে নির্বাচকরা কোনো পরিবর্তন না আসায় টিকে গেছেন পাকিস্তান সফরেও। কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকার যে অজুহাতটা নাঈম দিয়ে গেলেন, তার চেয়ে বোধহয় বিশ্রামে থাকাটাই ছিল তার জন্য মঙ্গলজনক।
