নতুন মোড় নিয়েছে থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা। সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ভোরে প্রতিবেশী দুই দেশ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত ১৪ জন আহত হয়েছেন। খবর রয়টার্স
থাই সেনাবাহিনী রয়েল থাই আর্মির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হতাহতের ঘটনা তিনটি ভিন্ন প্রদেশে ঘটেছে। সংঘর্ষের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, কাম্বোডিয়ান বাহিনী বৃহস্পতিবার সকালে থাই সেনাঘাঁটিতে ভারী আর্টিলারি ছোড়ে। এমনকি একটি হাসপাতালসহ বেসামরিক এলাকা লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়, যা বেসামরিক হতাহতের কারণ হয়েছে।
এদিকে সুরিন প্রদেশে আর্টিলারি শেল ঘরবাড়ির ওপর পড়ে, সেখানে ৮ বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারায়, বলে জানান কাবচিয়াং জেলার প্রধান সুত্থিরোট চারোয়েনথানাসাক। তিনি আরও বলেন, ৮৬টি গ্রামের ৪০ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, থাইল্যান্ডের সিসাকেত প্রদেশে একটি গ্যাস স্টেশনে আগুন ধরে যায়, যেখানে ৬ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। ইউবন রাচাথানি সীমান্ত প্রদেশে আরও একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে থাই সেনাবাহিনী।
থাই সেনাবাহিনী দাবি করেছে, জবাবে তাদের ছয়টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের একটি কাম্বোডিয়ার ভেতরে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। থাই সেনাবাহিনীর উপ-প্রবক্তা রিচা সুকসুয়ানন বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সামরিক টার্গেটে বিমান হামলা করেছি।’
উভয় দেশই একে অপরকে সংঘর্ষের জন্য দায়ী করেছে বলে প্রতিবেদনে জানায় রয়টার্স। কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, থাই যুদ্ধবিমান দুটি বোমা একটি রাস্তার ওপর ফেলে, যা ছিল পুরোপুরি ‘উসকানিমূলক ও বর্বর আগ্রাসন’। তারা থাইল্যান্ডকে কাম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘনের জন্য কঠোরভাবে দোষারোপ করেছে।
অপরদিকে থাইল্যান্ড জানিয়েছে, সংঘর্ষের আগে কাম্বোডিয়া একটি নজরদারি ড্রোন পাঠায়, এরপর তারা ভারী অস্ত্রসহ সৈন্য মোতায়েন করে। সংঘর্ষে দুই থাই সেনা সদস্য আহত হন।
কাম্বোডিয়ার বাহিনী রকেট লঞ্চারসহ একাধিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে, এমন অভিযোগ থাই সেনাবাহিনীর।
এদিকে, কাম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তানের জাতিসংঘ দূত আসিম ইফতিখার আহমাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক চিঠিতে হুন মানেত বলেন
‘থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক আগ্রাসন এ অঞ্চলের শান্তিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমি নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক আহ্বানের অনুরোধ করছি, যাতে থাইল্যান্ডের আগ্রাসন থামানো যায়।’
চিঠিটি কাম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়েছে।
এই সংঘর্ষের আগে থাইল্যান্ড তার রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনে এবং ব্যাংককে নিযুক্ত কাম্বোডিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়।
উল্লেখ্য, থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়ার সীমান্তে ৮১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত নির্ধারিত না হওয়ার কারণে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২০১১ সালেও উভয় দেশের মধ্যে এক সপ্তাহব্যাপী গোলাগুলিতে বহু প্রাণহানি ঘটে।
মে মাসে একজন কাম্বোডিয়ান সেনার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়, যা কূটনৈতিক সংকট থেকে সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। সর্বশেষ বুধবার থাইল্যান্ডে একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক সেনা গুরুতর আহত হন এবং তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। ১৬ জুলাই একই এলাকায় আরেকটি বিস্ফোরণে আরও তিনজন থাই সেনা আহত হয়েছিলেন, যার মধ্যে একজন তার পা হারান।
