রংপুর তথা উত্তরাঞ্চলের প্রতি এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের প্রতি বৈষম্য নিরসনের দাবিতে ব্লকেড ও ২ দফা দাবি এবং আল্টিমেটাম দিয়েছে বেরোবি ও রংপুরের ছাত্র-জনতা।
আজ সোমবার(২৮ জুলাই) বেলা ১২টা থেকে বেরোবির প্রধান ফটক থেকে মিছিল শুরু করে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সেটি উত্তরাঞ্চল-ঢাকা সংযোগ স্থল মডার্ন মোড় গিয়ে শিক্ষার্থীরা ব্লকেড কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। ব্লকেড কর্মসূচি চলাকালে তারা নানা ধরনের স্লোগানে মুখরিত করে তোলে এবং তাদের দাবি জানান।
জানা যায়, গতকাল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একনেক সভায় রংপুর এবং বেরোবির জন্য কোনো বাজেট অনুমোদন হয়নি এবং এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরো ১১টি একনেক সভায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কোনো বাজেট অনুমোদন পায়নি সেইসঙ্গে রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্যও তেমন কোনো বাজেট অনুমোদন পায়নি বলে তারা জানায়৷ এবং এই প্রেক্ষিতে তারা এ কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে জানা যায়, গত ১০ আগস্ট ২০২৪ সালে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসসহ অন্যান্য উপদেষ্টা এসে ঘোষণা দেন রংপুর এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় হবে সরকারে প্রথম প্রায়োরিটি এবং রংপুর হবে প্রথম সারির বিভাগ। তবে আশ্বাস পেয়েও উন্নয়নের জন্য দৃশ্যমান বাজেট না পেয়ে তারা এ ধরণের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে।
এ মিছিল ও ব্লকেড কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী নানা ধরণের স্লোগান দেন। যেখানে তারা বলেন, 'রক্ত লাগলে রক্ত নে তবু আমাদের বাজেট দে'; 'রক্তের স্রোত উত্তরে বাজেট কেনো দক্ষিণে'; 'ঢাবির সিন্ডিকেট-ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও'; 'ইন্টেরিমের দালালেরা হুঁশিয়ার-সাবধান'; 'জুলাইয়ে হাতিয়ার-গর্জে উঠো আরেকবার'।
আন্দোলনে উপস্থিত ছাত্রজনতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, এখানে আমাদের উপস্থিত হওয়ার কথা নয়। আমাদের হিস্যা যদি আমাদের বুঝিয়ে দিতো এভাবে রোদে পুড়ে কষ্ট করতে হতো না। আশ্বাসের মূলা না ঝুলিয়ে আমাদের বাস্তবিক কোনো কিছু দিক আমরা তাই চাই। একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিন্তু তেমন কোনো সুবিধা নেই, রংপুর অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন নেই, কৃষিখাতে কিছুই নেই বলা যায়, রংপুর সিটি করপোরেশনে কোনো বাজেট নেই কিংবা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র পাড়ের মানুষদের নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। এগুলো কি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ভাবতে পারে? কেন এত বৈষম্য, সেগুলোরই নিরসন চাই।
কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে জুলাইয়ে আহত ও সাবেক সমন্বয়ক শাহরিয়ার সোহাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রংপুর বরাবর বৈষম্য লক্ষ্য করেছি, রংপুরে কোনো উপদেষ্টাও নাই এই সরকারে যার ফলে আমাদের দাবি নিয়ে ভায়া হয়ে যেতে হয়েছে। আমরা চাই রংপুরে স্থায়ী উন্নয়ন প্রকল্প দাঁড় হোক এবং আঞ্চলিক কমিশন হোক।
কুড়িগ্রামের শিক্ষার্থীরা বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের কোনো শাসন ব্যবস্থা নাই, না আছে বন্যায় মোকাবেলা করার কোনো ব্যবস্থা। ব্রহ্মপুত্রের নদীভাঙনে প্রতিদিনই রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারীর শতশত লোক ঘর-ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছে। সরকারের এদিকে তো কোনো নজরই নেই। সরকার কি আমাদের দেখবে না? নাকি এই সরকার শুধু ধনীদের আর ঢাকার কাছাকাছিদের? আমরা আমাদের উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন ও তিস্তা,ব্রহ্মপুত্রে ভাঙনরোধ চাই।
শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, বারবার কেনো রংপুরই। লাশ দিবে রংপুর আর অবহেলাতেও রংপুর? উপদেষ্টারা এসে কেনই বা বারবার মিস্টি করে আমাদের আশ্বাস দিয়ে যান যদি পালনই না করতে পারেন।
এ বিষয়ে বেরোবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, রংপুর সব সময়ই সরকারের বৈষম্যের শিকার হয়েছে—সব সরকারের আমলেই। অথচ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা থেকেছেন, তাদের বেশিরভাগই এ অঞ্চলের বাসিন্দা। তবু রংপুরের প্রতি বৈষম্য কমেনি, বরং তা প্রকট হয়ে উঠেছে। চলমান বাজেটে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি—যা একটি স্বাধীন দেশের বাস্তবতায় কল্পনাতীত। এমন বৈষম্য পাকিস্তান আমলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এতটা প্রকট ছিল না। বরাবরই অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বাজেট বরাদ্দে রংপুর বিভাগ অবহেলিত। অথচ এক সময়ের অন্যতম সমৃদ্ধ এই অঞ্চল আজও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত।
মডার্ন ব্লকেড কর্মসূচির শেষ দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র জনতা দুটি দাবি পেশ করেন। তাদের দাবি দুটি হলো, প্রথমত, উত্তরবঙ্গের বাজেট বৈষম্য নিরসন ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং অবকাঠামোগত খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত কল্পে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক কমিশন গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরকে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণে যা করণীয় তা করতে হবে।
দাবি জানানোর পর তারা বলেন, এই দাবিগুলো পূরণের জন্য তারা ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হলো। দাবি পূরণ না হলে বেরোবির সকল শিক্ষার্থী ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করবে এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের লক্ষ্যে রংপুরে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলবেন।
এ ছাড়া তারা পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আগামী ২৯ জুলাইয়ে আবু সাঈদ চত্ত্বরে একত্রিত হয়ে মার্চ টু ডিসি অফিস এবং মার্চ টু বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ঘোষণা করেন এবং সেখানে তারা স্বারকলিপি প্রদান করবেন বলে জানান।
