দীর্ঘ ১৬ বছরের যাত্রায় ছাত্রসংসদ না পাওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর সদ্য ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও তা নিয়ে এখনও নানা জল্পনাকল্পনা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রশাসন থেকে বারংবার আশ্বাস দিলেও তা রক্ষার জন্য নেই কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, গতিপথ ও ধারাবাহিকতা।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই ছাত্রসংসদের নামে আদায় হয়ে আসছিল ফি। ছাত্ররা বিভিন্ন সময়ে সংসদের দাবি তুললেও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের কাছে টেকেনি এ দাবি, আদায় করতে পারেনি নিজেদের অধিকার। তবে গতবছর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিবর্তন ও বেরোবি প্রশাসনের ভিত্তি ভেঙে গেলে সে বছরের ৮ আগস্ট থেকে পুনরায় দাবি ওঠে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতাকর্মী, ছাত্রদল, বামসংগঠনসমুহ, ছাত্রশিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বারবার বিভিন্নভাবে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠার জন্য জোড় দাবি জানাতে থাকে।
১৮ সেপ্টেম্বর উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পরে পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে নির্বাচন দ্রুত সময়ের মধ্যে দেওয়ার ঘোষণা দেন ৬ষ্ঠ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত সেভাবে দাঁড়ায়নি নির্বাচন কাঠামো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রসংসদ বাবদ যে ফি আদায় করা হয়, এই ফির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে বর্তমান প্রশাসনসহ বিগত প্রশাসনের কেউই খোঁজ দিতে পারেননি আদায়কৃত তহবিল কোথায় কিংবা সেগুলো ব্যবহার হয়ে থাকলেও কোন খাতে হয়েছে, ছিল না এই বাবদ কোনো আলাদা হিসেব নম্বরও। এদিকে প্রথমেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়েন উপাচার্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারেন এই ফির নেই কোনো নির্দিষ্টতা, কোথায় আছে কেউই বলতে পারছে না।
তবে সম্প্রতি কয়েকমাস থেকে আদায়কৃত টাকা নির্দিষ্টভাবে গচ্ছিত করে রাখা হচ্ছে বলে জানায় বর্তমান প্রশাসন। এ ছাড়া বর্তমান প্রশাসন নির্বাচন আশ্বাস দেয়ার পর জানতে পারে যে, আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনতন্ত্র ও আইনেই নেই ছাত্রসংসদ!
এ নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে আশ্বাস দেন ২০২৫-এর প্রথমেই হবে ছাত্রসংসদ, তবে সে সময়ের মধ্যে আইন ও গঠনতন্ত্রের খসড়াই প্রস্তুত করতে পারেনি তারা৷ পরবর্তীতে সময় বাড়িয়ে নিয়ে বছরের মাঝামাঝি নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করা হয়। দাবিরত শিক্ষার্থীরা এবাবেও সে আশ্বাস মেনে নেয় কিন্তু সেক্ষেত্রেও ফল আসেনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করতে থাকেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সেসবের তোয়াক্কা না করলে আগস্টের শুরুতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করেন এবং পরবর্তীতে ছাত্রসংসদসহ বিভিন্ন দাবিতে আল্টিমেটাম দেন। সেসবেও কাজ না হলে গত ১৭ আগস্ট থেকে খসড়া আইন করে পাস ও রোডম্যাপের দাবিতে অনশনে বসেন শিক্ষার্থীরা৷ টানা ৪ দিনের অনশনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকে অনশনরতরা। তবে প্রথমদিন থেকেই নানা মুখরোচক কথা, আশ্বাস প্রশাসন কর্তৃক দেওয়া হলেও তারা অটল ছিলেন। পরে বিভিন্ন মহল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতে থাকে। পরে প্রশাসনের লিখিত আশ্বাসের ভিত্তিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অনশন ভাঙেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হবে বলে আশাবাদও করেন।
কিন্তু এ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এই সময়ের মধ্যে আইনের অনুমোদন নিতে পারেনি প্রশাসন। এ নিয়ে ক্ষুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইনে যুক্ত করার লক্ষ্যে খসড়া আইন প্রস্তুত ও অনুমোদনের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তারা বেশ কয়েকবার ইউজিসির সঙ্গে মিটিং করেন ও কাজদ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করে যান এবং সর্বশেষ আরো এক সপ্তাহ লাগতে পারে বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ঠিক কি কারণে এত দিনের সময় লাগছে সেটা পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারেনি কেউই। তবে আইনে যুক্ত করতে না পারলেও যথাসময়ে অর্থাৎ ৩০ অক্টোবরেই নির্বাচন হবে বলে আশাব্যক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
এদিকে বারবার সময় নিয়ে এবং আশ্বস্ত করে তা পূর্ণ করতে না পারায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা করতে থাকেন। অনশনকারীসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছেন এই নির্ধারিত সময়ের ভিতরেও নির্বাচন দিতে পারবে না প্রশাসন।
তারা আশঙ্কা করে বলেন, সেপ্টেম্বর পেরিয়ে এখন অক্টোবরের প্রায় মাঝামাঝি তবুও আইনেই যুক্ত হয়নি। এরপর কবে যুক্ত হবে, কবে রোডম্যাপ, তফশিল ঘোষণা, ভোটার তালিকা কিংবা মনোনয়ন দেয়াসহ নানা কাজ হবে? এসব ভাবলে যে কেউই বলবে ৩০ অক্টোবর নির্বাচন সম্ভব নয়।
এদিকে গত ৭ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, পূর্বঘোষিত ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ছাত্রসংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্রসংসদ অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। গত ৫ ও ৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিছু অসঙ্গতি সংশোধন করে আজই প্রস্তাবটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে তা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সংযুক্ত করা হবে।
এ ছাড়া অনেকটা জোর দিয়েই বলেন, স্বায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে প্রথম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হবে, সেটি হবে বেরোবি।
তবে তার এ বক্তব্যের পরে নতুন করে আলোচনায় আসে এই ছাত্রসংসদের বিষয়টি। সব মহলের শিক্ষার্থীরাই নির্বাচন পেছানো কিংবা না হওয়ারও আশঙ্কা করেন অনেকে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বরাবরই আশাহত হয়েছি। বারবার শুধু আশ্বস্তই হই কিন্তু তা বাস্তবে কিছু পাই না। বুঝতেছি না প্রশাসন থেকে কিভাবে এত জোর গলায় এসব বলা হচ্ছে যেখানে কিনা এখনও আইনেই পাস হয়নি।
ছাত্রসংসদের দাবিতে আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থী ও সাবেক সমন্বয়ক আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি ছাত্রসংসদ নির্বাচন হবে। তবে একটা শঙ্কার জায়গা তৈরিই হয়েছে যে নির্দিষ্ট সময়ে দিতে পারবে কি না। কেননা এখনও বিভিন্ন প্রসিডিউর বাকি। যদিও তারা আইনে যুক্ত করতে আরো এক সপ্তাহ সময় চেয়েছে। তবে এবারে টালবাহানা হলে আমরা আরো কঠোর আন্দোলন করবে, ঢাকায় গিয়ে অনশন করব। তবুও ছাত্রসংসদের দাবি পূরণ করবই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদল কর্মী হাফিজুর রহমান সিয়াম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চাই দ্রুত নির্বাচন হোক। তবে রোডম্যাপ থেকে শুরু করে সবকিছুর জন্য সময় প্রয়োজন। বিগত সময়ে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে সেখানেও দেখেছি বেশ কয়েকদিন আগে থেকে কার্যক্রম শুরু হয়। সেই হিসেবে আগামীকালও তফসিল ঘোষণা করে তাহলেও ৩০ তারিখে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নাই, সেখানে এখনও তো আইনেই যুক্ত হয়নি। ঐ জায়গা থেকে শঙ্কা থেকেই যায়।
এ নিয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের আহমাদুল হক আলবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা খোঁজ নিয়েছি, দ্রুত কাজ এগোচ্ছে; সবদিকেই পজিটিভ। যদি নির্দিষ্ট সময়ে না হয় তাহলে আমরা সেটা আদায়ের জন্য উপাচার্যকে একটা সিচুয়েশনে দাঁড় করাবো। নির্বাচন হতেই হবে।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ নিয়ে বিস্তারিত পরে কথা বলতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশীদ বলেন, ছাত্রসংসদ নিয়ে তো উপাচার্য প্রেস কনফারেন্সে করলেন। ওগুলোই কথা৷
তবে শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি অক্টোবরেই দেব। তবে অনশন ভাঙার সময় ছাত্ররাও মনে হয়ে বলেছিল দুই একদিন এদিক সেদিক হলে মেনে নেব। আমার মনে হয় আমরা এখনও টাইমের মধ্যেই আছি।